​সিঁড়ির নিচে পিয়নের ঘুষের হাট: জাল দলিলে নামজারির নেপথ্যে শফি-নায়েব শর্মিষ্ঠা সিন্ডিকেট!


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৪, ২০২৬, ৫:৩৬ অপরাহ্ন /
​সিঁড়ির নিচে পিয়নের ঘুষের হাট: জাল দলিলে নামজারির নেপথ্যে শফি-নায়েব শর্মিষ্ঠা সিন্ডিকেট!

* ​সিঁড়ির নিচে বসে প্রকাশ্যে চলছে ঘুষ লেনদেন, এসেছে ভিডিও প্রমাণ

* ​২ লাখ টাকার বিনিময়ে জাল দলিলে ২টি নামজারি অনুমোদন

* ​আলিশান বাড়িসহ প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার অঢেল সম্পদের মালিক সাধারণ পিয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : টাকা পেলেই অসাধ্য সাধন করতেন সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসের পিয়ন শফিউর রহমান শফি। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকারকে হাত করে শুধু নামজারি ও খাজনা দাখিলার রিপোর্ট প্রদান সিন্ডিকেটেই ক্ষান্ত হননি শফি। তিনি জড়িয়ে পড়েছেন জাল দলিল তৈরি ও তা দিয়ে নামজারি করানোর মতো মারাত্মক অপরাধ চক্রে।​অনুসন্ধানে জানা যায়, জাল দলিল চক্রের সদস্য ধুলিহরের কালাম ও দেবহাটার করিম মুহুরীকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন শফি। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ২ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে দুটি জাল দলিলের বিপরীতে নামজারি অনুমোদন করিয়ে নেন নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের কাছ থেকে। জানা গেছে, নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় কিছু তথ্য জেনে ফেলার কারণে শর্মিষ্ঠা সরকারও শফির ওপর একধরনের দুর্বল হয়ে পড়েন। নিজের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অনৈতিক আর্থিক লাভের আশায় নায়েব শর্মিষ্ঠা শফির সাথে হাতে হাত মেলান। চুক্তি অনুযায়ী ২ লাখ টাকার মধ্যে নায়েব শর্মিষ্ঠা পান ১ লাখ টাকা এবং বাকি ১ লাখ টাকা নেয় শফির সিন্ডিকেট।​সম্প্রতি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে সদর ভূমি অফিসের সিঁড়ির নিচে বসে প্রকাশ্য ঘুষ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর একটি ভিডিও ফুটেজ। ফুটেজে দেখা যায়, অফিসের সিঁড়ির নিচে বসে অবাধে ও প্রকাশ্যে ঘুষের টাকা গুনছেন পিয়ন শফি। যেন সেখানে বসানো হয়েছে এক ‘ঘুষের হাট’।​উল্লেখ্য, জাল দলিল দিয়ে যেসব নামজারি করানো হয়েছে, সেগুলোর মূল দলিল দেখতে সাতক্ষীরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সন্ধান (সার্চ) দেওয়া হলে বালাম বইয়ের তথ্যের সাথে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত কর্মচারীরা জানান, সংশ্লিষ্ট দলিল নম্বরের বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা ছেঁড়া পাওয়া গেছে।​অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে একজন ১৬-১৭ হাজার টাকা স্কেলের সরকারি পিয়নের রাজকীয় জীবনযাপনের চিত্র। ঢাকায় অধ্যয়নরত ছেলের পড়াশোনা ও ফ্ল্যাট ভাড়ার জন্যই তিনি প্রতি মাসে গুনছেন ৫০ হাজার টাকা, যা তার মূল বেতনের প্রায় তিন গুণ! একজন সাধারণ কর্মচারীর এমন দাপট, অঢেল সম্পদ ও দুর্নীতি দেখে তাজ্জব বনে গেছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।​সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একজন পিয়নের সারা জীবনের চাকরি থেকে অর্জিত মোট আয় সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা হতে পারে। অথচ শফির দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা! অনুসন্ধানে জানা গেছে,শহরের পারকুকরালীতে ৩টি এসি লাগানো চোখধাঁধানো ২ তলা আলিশান বাড়ি রয়েছে তার।সাতক্ষীরা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খড়িলের বিলে কিনেছেন কয়েক একর কৃষি জমি।শ্বশুরবাড়ি এলাকায় (খুলনা) কিনেছেন কোটি টাকার প্লট।সম্প্রতি ৭ লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধ করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, সদর ভূমি অফিসে কোনো আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। শফিকে টাকা দিলেই যেকোনো অবৈধ বা বিতর্কিত দলিলের বিপরীতে নিমেষেই মিলছে নামজারি। পক্ষান্তরে, সাধারণ মানুষ সরাসরি আবেদন করলে বা ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয় কিংবা সার্ভার থেকে বাতিল করে দেওয়া হয়।​টানা দুর্নীতির পরও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় শফির দাম্ভিকতা এখন আকাশচুম্বী। প্রকাশ্যে তিনি বলে বেড়ান,খুলনা বিভাগীয় কমিশনার অফিসে আমার শক্তিশালী হাত রয়েছে। ভোমরা থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ করে সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসে এসেছি, এত সহজে আমাকে কেউ বদলি করতে পারবে না। খোদ এসিল্যান্ডের ক্ষমতা নেই আমাকে এখান থেকে সরানোর। একজন সামান্য পিয়নের মুখে এমন মুক্ত চ্যালেঞ্জ ও দম্ভোক্তিতে হতবাক স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহল।ভূমি সেবা নিতে আসা কামাল নগরের ভুক্তভোগী আমীন রহমান জানান,শফি সদর ভূমি অফিসের মূল সিন্ডিকেট প্রধান। নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নায়েবকে দিয়ে শফি নামজারি ও জাল দলিলের কাজ করাতেন। আমার কাজ করানোর জন্য ৮ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। বলেছিলেন টাকা নায়েব শর্মিষ্ঠাকে দিতে হবে, তিনি সামান্য ভাগ পাবেন।​কাটিয়ার আরেক ভুক্তভোগী আবুল হোসেন জানান, “শফি ভাইকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়েছি। তিনি আমাকে নায়েব শর্মিষ্ঠার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। নায়েব বলেন, ফাইল নিয়ে আসেন, টাকা আয় করেন। কিন্তু লেনদেনের সময় শফি আমার সাথে প্রতারণা করতেন এবং লাভের সিংহভাগ নিজে রেখে দিতেন।অভিযোগের বিষয়ে পিয়ন শফিউর রহমান শফির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার স্থাবর-অস্থাবর জমি-জমা ও বাড়ি সবই বৈধ আয়ের। তবে নায়েব শর্মিষ্ঠা ম্যাডামকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়েছি এটা সত্য। নায়েব ম্যাডামই আমাকে বলেছিলেন বসে না থেকে নামজারি ও বড় বড় কাজ ধরতে, তিনি করে দেবেন। যেসব ফাইল ধরতাম, তার সিংহভাগ টাকা ম্যাডামকে দিতে হতো, আমি শুধু সামান্য কমিশন পেতাম। বাড়ি করার টাকা আমি চাকরির বেতন থেকে জমিয়ে করেছি। আর ছেলে ঢাকায় পড়ালেখা করে কথাটি সত্য।