
বিশেষ প্রতিবেদক : ঘুষের বিনিময়ে অসাধ্য সাধন করাই যেন তার পেশা। টাকা ফেললেই জাল বা ভুয়া দলিলেও অনায়াসে হয়ে যায় নামজারি (মিউটেশন)। সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসের ২০তম গ্রেডের পিয়ন শফিউর রহমান শফির বিরুদ্ধে এবার উঠে এসেছে জাল দলিলে নামজারি করিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। কেবল স্থানীয়ভাবে জমিজমা বা আলিশান বাড়িই নয়, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ঢাকায় পড়ুয়া ছেলেকে রাখতে প্রতি মাসে শুধু ফ্ল্যাট ভাড়াই গুনছেন ৫০ হাজার টাকা! একজন সরকারি পিয়নের এমন রাজকীয় জীবনযাপন, দাম্ভিকতা ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট দেখে তাজ্জব বনে গেছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।স্থানীয় সেবাগ্রহীদের অভিযোগ, সদর ভূমি অফিসে নিয়ম,নীতির কোনো বালাই নেই। শফি পিয়নকে টাকা দিলে যেকোনো অবৈধ বা বিতর্কিত দলিলের বিপরীতেও মিলছে নামজারি। সাধারণ মানুষ সরাসরি আবেদন করলে বা ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা কিংবা সার্ভার থেকে বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু শফির মাধ্যমে চুক্তি করলে অসাধ্য কাজও নিমিষে বাস্তবায়িত হয়। শফি এসিল্যান্ড অফিস ও পৌর ভূমি অফিসের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে দীর্ঘ দিন ধরে এই সিন্ডিকেট চালিয়ে আসছেন।অভিযোগ রয়েছে, টানা দুর্নীতির পরও কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় শফির দাম্ভিকতা আকাশ ছুঁয়েছে। বিভিন্ন মহলে খোলাখুলিভাবে বলে বেড়াচ্ছেন তার ক্ষমতার দাপটের কথা। শফি অহংকার করে বলেন, “খুলনা বিভাগীয় কমিশনার অফিসে আমার শক্তিশালী লোক রয়েছে। ভোমরা থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ করে সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসে এসেছি, অত সহজে এখান থেকে আমাকে কেউ সরাতে বা পোস্টিং করাতে পারবে না। আমি বিভাগীয় কমিশনারের অফিস ঠিক রাখি, খোদ এসিল্যান্ডের ক্ষমতা নেই আমাকে এখান থেকে বদলি করানোর।” একজন সাধারণ পিয়নের মুখে এমন সরাসরি চ্যালেঞ্জ ও ওপেন স্টেটমেন্টে হতবাক স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ জনগণ।সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একজন পিয়নের মাসিক স্কেল বেতন মাত্র ১৬-১৭ হাজার টাকা। চাকরিজীবনের সব মিলিয়ে সাকুল্যে যেখানে আয় হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৪০-৪৫ লাখ টাকা, সেখানে শফির দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা!শহরের পারকুকরালীতে ৩টি এসি লাগানো আলিশান ২ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সাতক্ষীরা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খড়িলের বিলে কিনেছেন কয়েক একর কৃষি জমি।শ্বশুরের বাড়ি খুলনায় কিনেছেন কোটি টাকার প্লট। সম্প্রতি ৭ লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধ করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।সবশেষ অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকায় অধ্যয়নরত ছেলের জন্য প্রতি মাসে শুধু ৫০ হাজার টাকা ফ্ল্যাট ভাড়াই পাঠান এই পিয়ন, যা তার মূল বেতনের দ্বিগুণেরও বেশি!ভূমি সেবা নিতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী জানান, নামজারি ও খাজনা দাখিলার রিপোর্ট পেতে শফিকে ফাইলপ্রতি ৭-৮ হাজার টাকা পর্যন্ত গুণতে হয়। ভুক্তভোগী এক সেবাগ্রহীতা জানান, “অনলাইনে আবেদন করে ডকুমেন্টস জমা দিলে ফাইল আটকে দেওয়া হয়। পরে শফিকে টাকা দেওয়ার পরদিন mysteriously সেই ফাইল অনুমোদন পেয়ে যায়।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পিয়ন শফিউর রহমান শফি ঘুষ গ্রহণ ও জাল দলিলের কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি হজ করেছি, এসবের সাথে আমি যুক্ত নই। ঢাকায় ছেলের পড়াশোনা ও বাড়ির খরচ আমি কষ্ট করে টাকা জমিয়ে চালাই। আমার জমি-জমা সবই বৈধ আয়ের।একজন সাধারণ পিয়নের এমন আলাদিনের প্রদীপের মতো সম্পদ অর্জন, বদলি নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ এবং জাল দলিলে মিউটেশন বাণিজ্য নিয়ে সাতক্ষীরার সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
আপনার মতামত লিখুন :