
* ডিজিটাল মেশিনের অপারেশনে ৫০ হাজার টাকা বিল।
* সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নিজের ক্লিনিকে চিকিৎসা।
* দরিদ্র রোগীদের গরু বিক্রি ও সুদে টাকা এনে বিল পরিশোধের ধুম।
নিজস্ব প্রতিবেদক : চিকিৎসা পেশা বিশ্বজুড়ে এক মহান সেবামূলক কাজ হিসেবে মর্যাদাপ্রাপ্ত। সৃষ্টিকর্তার সেরা জীব মানুষকে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত করে জীবন বাঁচান চিকিৎসক। কিন্তু সেই সেবামূলক পেশা যখন সহায়-সম্বলহীন মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদে পরিণত হয়, তখন নির্মমতার সীমা থাকে না। অসহায় রোগীদের এই সুযোগ নিয়ে পাইলস্ চিকিৎসার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘ঝাউডাঙ্গা বাজারে অবস্থিত পাইলস্ এন্ড মাল্টিকেয়ার হাসপাতাল’এর বিরুদ্ধে।অভিযোগ রয়েছে,মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে ডিজিটাল মেশিনের কারসাজিতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সামান্য পরীক্ষা ও অপারেশনেই রোগীদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার বিল।পাইলস্ এন্ড মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে রয়েছেন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্টার ডা. সুজিত রায়।স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে সেবা না দিয়ে নিজের ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসার প্রলোভন দেখান তিনি। এজন্য গড়ে তুলেছেন দালাল ও কিছু অসাধু গরীবের রক্ত চোষা গ্রাম্য ডাক্তারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিজের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন তারা। পাইলস্ হাসপাতালে রোগী পৌঁছে দিলে দালালরা পান মোটা অঙ্কের কমিশন, যা পরবর্তীতে যুক্ত হয় ওই রোগীর চিকিৎসার বিলেই। যেখানে অল্প খরচে চিকিৎসা সম্ভব, সেখানে একজন পাইলস্ রোগীকে চিকিৎসার পেছনে খোয়াতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই ডা. সুজিতের দালাল ও গ্রাম্য ডাক্তারদের সিন্ডিকেট রয়েছে। একটি রোগী ঝাউডাঙ্গা পাইলস্ হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারলে দালালদের দেয়া হয় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা কমিশন। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ দালালরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকেন।সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. সুজিত মেডিকেলে সার্জারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত থাকলেও তিনি পাইলসে্র চিকিৎসা দেন প্রধানত তার পাইলস্ এন্ড মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে । মেডিকেল কলেজে কোনো পাইলসে্র রোগী চিকিৎসা নিতে আসলে তিনি নিজ মুখেই বলেন, “এখনই আমার ঝাউডাঙ্গা মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে যান, আপনার চিকিৎসা সেখানেই ভালো হবে।শ্যামনগরের আটুলিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগী মুজাহিদ আলম বলেন, “আমি উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষ, চিকিৎসা সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। দীর্ঘদিন পাইলস্ রোগে ভুগছিলাম। সাতক্ষীরা মেডিকেলে আসার পর ‘রফিক’ নামে এক দালাল আমাকে মাল্টিকেয়ার পাইলস্ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে যাওয়ার পর প্রথমে বিভিন্ন পরীক্ষার নামে ৮-৯ হাজার টাকা বিল করা হয়। পরবর্তীতে ডিজিটাল মেশিনে পাইলস কাটার কথা বলে আবার বিল করা হয় ৪০ হাজার টাকা। সর্বমোট ৫০ হাজার টাকা বিল দেখে আমি হতবাক হয়ে পড়ি। আমি গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব? বাধ্য হয়ে ঘরের দুধের গাভীটি বিক্রি করে ক্লিনিকের বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।আরেক ভুক্তভোগী দেবহাটার শাকরা কোমরপুরের করিম মুহুরী জানান, “বছরখানেক ধরে আমি পাইলস রোগে আক্রান্ত। গ্রামের এক ভাইয়ের মাধ্যমে ডা. সুজিতের কাছে যাই। তিনি দেখে বলেন, অবস্থা ভালো নয়, এখনই ভর্তি হয়ে অপারেশন করাতে হবে এবং টাকা জমা দিতে হবে। ডাক্তারের কথা শুনে ভয়ে ভর্তি হয়ে যাই। প্রথমে কয়েক ধরনের পরীক্ষা দেওয়া হয়, এরপর অপারেশন থিয়েটারের বিল আসে ৪১ হাজার টাকা। যে চিকিৎসার স্বাভাবিক খরচ ১০-১২ হাজার টাকা, সেখানে তিন গুণেরও বেশি বিল ধরা হয়েছে। বিল নিয়ে আমার ছেলে প্রতিবাদ করলে ক্লিনিকের ম্যানেজার তার ওপর চড়াও হন এবং বিল না দিলে যেতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন। পরবর্তীতে চড়া সুদে টাকা ধার করে এনে সেই বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।কালিগঞ্জের এক অধ্যাপিকা উম্মে ফাতিমা তুজ জোহরা বলেন, “পাইলস্ সমস্যার কারণে শ্যামনগরে ওই ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছিলাম। তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেলের কথা না বলে তার নিজের ঝাউডাঙ্গার ক্লিনিকে ভর্তি হতে বলেন। আমি দুদিন পর ভর্তি হই। অপারেশন শেষে ৩৭ হাজার টাকার বিল করা হয়। কিন্তু নামমাত্র অপারেশন করা হলেও চিকিৎসা ভালো হয়নি, আমি এখনও একই সমস্যায় ভুগছি। ডাক্তারদের এমন চিকিৎসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়া উচিত, তা না হলে পুরো পেশাই কলঙ্কিত হবে।এ বিষয়ে নাগরিক নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, “চিকিৎসা পেশা আজ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। একজন চিকিৎসক হয়েও কীভাবে মানুষের পকেট কাটা যায়, সেটাই এখন মূল চিন্তা। পাইলস্ চিকিৎসার নামে ডা. সুজিত অত্যন্ত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সেবামূলক পেশায় থেকে রোগীদের জিম্মি করার এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে এবং ওই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।সাতক্ষীরা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিজের বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া, অতিরিক্ত বিল আদায়, ভুল/নামমাত্র চিকিৎসা প্রদান এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন, মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) আইন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে একাধিক ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও শাস্তির বিধান রয়েছে।ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ধারা ৪৫ ও ৫২ সেবা প্রদানে অবহেলা, প্রতারণা ও অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া ধার্যকৃত হারের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা, চুক্তিকৃত সেবা সঠিকভাবে না দেয়া এবং রোগীর জীবন সংশয়ে ফেলা।সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড। এছাড়া ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক অধ্যাদেশ, ১৯৮২ Medical Practice and Private Clinics and Laboratories Ordinance, 1982 দালালাশ্রিত ব্যবসা পরিচালনা, ভুয়া বিল তৈরি, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং ক্লিনিকের অননুমোদিত/অনিয়মিত চিকিৎসা পরিবেশ কারণে ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল, প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করা এবং পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত ডা. সুজিত রায় বলেন, “আমি এখন খুব ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব। আমার হাত অনেক লম্বা, আপনাদের যা খুশি তা লিখতে পারেন, তাতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন “অবৈধভাবে পরিচালিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। আপনারা বিষয়টি তুলে ধরলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।এদিকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ডা.শেখ কুদরত-ই-খুদা বলেন ডা. সুজিত মেডিকেল হাসপাতাল থেকে রোগীকে ভয় দেখিয়ে তার ক্লিনিকে ভাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ আগেও অনেক শুনেছি।আবার আপনাদের মাধ্যমে শুনলাম। তার বিরুদ্ধে এবার আমি আইনগত ব্যবস্থা নিব।
আপনার মতামত লিখুন :