
* পারকুকরালী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (৩ টা এসি) ২ তলা আলিশান বাড়ি।
* কয়েক একর কৃষিজমি ক্রয়।
* সন্তানদের উচ্চব্যয়ে পড়ালেখা।
* ব্যাংকে লক্ষ লক্ষ টাকার ডিপোজিট।
নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘুষের টাকায় লালে লাল হয়ে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছে সদর ভূমি অফিসের পিয়ন শফিউর রহমান শফি। শফির হাতে প্রায় সময় জিম্মি হয় এসিল্যান্ড অফিসে আসা ভূমি সেবাগ্রহীতারা। নামজারি ও খাজনা দাখিলার রিপোর্ট প্রদান করিয়ে দেওয়ার নামে হাতিয়ে নেয় নগদ অর্থ।শফি এসিল্যান্ড অফিসের কর্মচারী হয়েও সদর ভূমি অফিস জিম্মি করে হয়ে উঠেছিলেন ঘুষের ‘মহারাণী’ নায়েব শর্মিষ্ঠার একান্ত দালাল। ভূমি সেবা নিতে আসা সেবাগ্রহীদের বলতেন নায়েব শর্মিষ্ঠাকে নামজারিতে ২ হাজার টাকা দিতে হয় আর এসিল্যান্ড অফিসে ১২০০ টাকা, সব মিলিয়ে ৬-৭ হাজার টাকা খরচ। নায়েব শর্মিষ্ঠা সরাসরি নামজারির ফাইল না নেওয়ায় শফি এই সুযোগ কাজে লাগাত। নায়েব শর্মিষ্ঠাকে সরাসরি নামজারির ফাইল দিলে বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল করতেন। একই ফাইল শফিকে টাকা দিলে সেটা সাবমিট করতেন। নায়েব শর্মিষ্ঠা শফিকে বড় বড় ফাইল ধরার পরামর্শ দিতেন এবং বলতেন, “এসিল্যান্ড আমার কাছে, আমি ফাইল ছাড়িয়ে দেব, তুমি পার্সেন্ট পাবা।” নায়েব ও শফি নিজের বাড়িতে বানিয়েছিলেন ভূমি অফিস, সেখানে ভূমি সেবাগ্রহীদের এসে ফাইল জমা দিতে দেখা গেছে।সরজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, পিয়ন শফি শহরের পারকুকরালীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (৩ টা এসি লাগিয়ে ) ২ তলা আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খড়িলের বিলে কয়েক একর কৃষি জমি ক্রয় করেছে, খুলনায় শ্বশুরের বাড়ির পাশে প্লট ক্রয় করেছে এবং ছেলেকে ঢাকায় উচ্চব্যয়ে পড়ালেখা করায়। ৭ লাখ টাকা দেনমোহর দিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাকও দিয়েছে। একজন পিয়ন ২০তম গ্রেড অনুযায়ী বেতন পায় ১৬-১৭ হাজার টাকা; টাইম স্কেল ও পদোন্নতি পেয়ে শেষ জীবনে ৩০-৩৫ হাজার টাকা বেতন পায়। শফি ৩০ বছর চাকরি করলে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী মোট বেতন পাবে ৪০-৪৫ লক্ষ টাকা, কিন্তু শফির দৃশ্যমান সম্পদ রয়েছে ৫-৬ কোটি টাকার। এই বেতনবহির্ভূত কোটি টাকার সম্পদের উৎস ঘুষ। শফি বিভিন্ন সময় ঘুষ কেলেঙ্কারিতে ফেঁসেছে। ভোমরায় থাকতে কান্তিলালের ঘুষের টাকা নিতে গিয়ে ফেঁসেছিল। সবসময় টাকার বিনিময়ে সদর ভূমি অফিসে কাজ করেছে, সদর ভূমি অফিসকে বানিয়েছিল ঘুষের অভয়ারণ্য।শফি এসিল্যান্ড ও ঘুষের ‘মহারাণী’ নায়েব শর্মিষ্ঠাকে হাতে রেখে নামজারি ও খাজনা দাখিলার সিন্ডিকেট করে বহু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শফির সদর ভূমি অফিসের ঘুষের একটা বড় অংশের ভাগ পেত নায়েব শর্মিষ্ঠা এমন সত্যতা অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে। এসিল্যান্ড অফিস ও পৌর ভূমি অফিসের ঘুষের মূল চাবিকাঠি ছিল শর্মিষ্ঠার হাতে, সে ছিল এসিল্যান্ডের প্রধান সেনাপতি।ভুক্তভোগী পলাশপোলের করিম বলেন, “আমি নামজারি করতে যাই সদর ভূমি অফিসে, নায়েব ছিল শর্মিষ্ঠা সরকার। আমি অনলাইনে আবেদন করে ডকুমেন্টস সাবমিট করলে নায়েব শর্মিষ্ঠা খরচের টাকা দাবি করে। আমি না দিলে দুদিন পর সার্ভার থেকে ফাইল ক্যানসেল করে ফেরত দেয়। পরে শফি আমাকে ডেকে ৭ হাজার টাকা দিলে নামজারি করিয়ে দেবে বলে আশ্বাস দেয়। আমাকে বলে, নায়েব শর্মিষ্ঠাকে টাকা দিতে হবে তাহলে তোমার ফাইল এসিল্যান্ড অফিসে যাবে, সবকিছু আমি ছাড়িয়ে দেব। আমি শফির কথা মতো ৭ হাজার টাকা দিই, নায়েব শর্মিষ্ঠা ফাইল ছাড়ে এবং আমার নামজারিও হয়ে যায়।আরেক ভুক্তভোগী সুলতানপুরের সুমন বলেন, “আমার একটা জমির ১৪৫ ধারার রিপোর্ট প্রদানের জন্য যাই সদর ভূমি অফিসে নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে। সে সরজমিনে পরিদর্শন করে আমি দখলে থাকলেও বিরোধী পক্ষের থেকে টাকা নিয়ে তাদের পক্ষে প্রতিবেদন তৈরি করে। আমি জানতে পেরে শফিমামুকে বলি। শফিমামু নায়েব শর্মিষ্ঠাকে ম্যানেজ করে আমার থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে আমার পক্ষে প্রতিবেদন করিয়ে দেয়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর ভূমি অফিসের আরেক পিয়ন বলেন, “শফি এসিল্যান্ড অফিসে কর্মরত হয়েও পৌর ভূমি অফিসে দালালি করত। নায়েব শর্মিষ্ঠা তাকে পাত্তা দিত বিশেষ কারণে। নায়েব শর্মিষ্ঠার সাথে এসিল্যান্ডের ভাল সম্পর্ক ছিল, তা শফি জানত। তাছাড়া এক গণমাধ্যমকর্মীর সাথে নায়েব শর্মিষ্ঠার গভীর প্রেমকাহিনী শফি জেনে ফেলে। সেই গণমাধ্যমকর্মী প্রায় সময় অফিস শেষে শর্মিষ্ঠার সাথে রুমে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত, কেউ থাকত না। এসব ঘটনা ও প্রেমালাপ শফি দেখে ফেলে। সেজন্য শফিকে হাতে রাখতে শফির দেওয়া ফাইল নায়েব শর্মিষ্ঠা কাজ করে দিত। ফাইল ছাড়ার বিনিময়ে নায়েব শর্মিষ্ঠার যে ঘুষের টাকা, সেটা সে দিয়ে দিত।অভিযুক্ত সদর ভূমি অফিসের পিয়ন শফিউর রহমান শফি বলেন, আমি হজ করেছি, ঘুষ খাই না। নায়েব শর্মিষ্ঠার সাথে ভাল সুসম্পর্ক ছিল, আমার আত্মীয়স্বজনদের কাজে পৌর ভূমি অফিসে যেতাম। আমি মূলত এসিল্যান্ড অফিসের পিয়ন। আমার বাড়ি-জমি আমি টাকা জমিয়ে করেছি। আপনারা নিউজ করলে আমার কিছু করার নেই।
আপনার মতামত লিখুন :