
আখলাকুর রহমান: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে সাতক্ষীরার সন্তান, এই ঐতিহাসিক সত্যটি আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই সম্পূর্ণ অজানা। চব্বিশ পরগনার পেয়ারা গ্রামে তাঁর জন্ম হলেও তাঁর পিতৃপুরুষের নাড়ির বন্ধন, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং জীবনের এক সুদীর্ঘ আবেগঘন অধ্যায় আবর্তিত হয়েছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভাদিয়ালী ও পেয়ারা গ্রামকে কেন্দ্র করে। তাঁর পিতা মফিজউদ্দিন আহমদ ছিলেন এই মাটিরই মানুষ। শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় সময় তিনি সাতক্ষীরার কলারোয়ার এই নিভৃত পল্লীতে কাটিয়েছেন। এখানকার কাঁচা মাটির গন্ধ, বেতবনের ছায়া এবং কপোতাক্ষের অববাহিকা তাঁর অবচেতনে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রথম বীজটি বুনে দিয়েছিল। এই জনপদের ধুলোবালি মেখেই তিনি বড় হয়েছেন এবং এখানকার গ্রামীণ জীবনের শব্দভাণ্ডার দেখেই পরবর্তীতে তাঁর মনে অভিধান রচনার আদি প্রেরণা জেগেছিল।
শিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রয়োজনে তাঁকে বারবার এই চিরচেনা মাটির সীমানা ছাড়িয়ে কলকাতা, ঢাকা কিংবা প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে। কলারোয়ার গ্রামীণ পাঠশালার আঙিনা থেকে বের হয়ে তিনি যখন বিশ্বমঞ্চে ভাষাতত্ত্বের পণ্ডিত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন, তখনও তাঁর অন্তরে সাতক্ষীরার সেই শান্ত নদী আর মাটির টান অক্ষুণ্ণ ছিল। জীবনের নানা বাঁকে, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক ছুটির দিনগুলোতে তিনি বারবার ছুটে আসতেন কলারোয়ার এই পৈতৃক ভিটায়। এখানকার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, লোকজ উৎসব আর প্রাত্যহিক জীবনের কথ্য রূপ তিনি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এই নিবিড় সংযোগের ফসলই হলো তাঁর যুগান্তকারী সৃষ্টি ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পণ্ডিতদের ড্রয়িংরুমের মার্জিত ভাষার চেয়ে এই মাটির মানুষের মুখের ভাষাই আসল প্রাণশক্তি।
দেশভাগের লগ্ন থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটে এই মাটির সন্তানই হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান বর্ম। ১৯৪৭ সালে যখন উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছিল, তখন এই কলারোয়ার মাটির গভীরে প্রোথিত অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়েই তিনি প্রথম গর্জে উঠেছিলেন। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অন্যায্য প্রস্তাবের জবাবে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি একাধারে চব্বিশটি ভাষা আয়ত্ত করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, অথচ তাঁর হৃদয়ের গভীরে চিরকাল ধ্বনিত হতো সাতক্ষীরার মানুষের চেনা বুলি। আহমদ ছফা যেভাবে মেধার প্রান্তিক শিকড় ও জাতীয় আত্মপরিচয়কে সাহিত্যের আলোয় নিয়ে আসতেন, ঠিক সেভাবেই আজ পত্রিকার পাতায় সাতক্ষীরার এই মহান আলোকবর্তিকার জীবনগাথাকে পুনরুজ্জীবিত করা আমাদের এক পরম জাতীয় দায়িত্ব।
লেখা : আখলাকুর রহমান
উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা
আপনার মতামত লিখুন :