উপকূলে নারীর অগ্রযাত্রার আরেক নাম শম্পা গোস্বামী
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৫, ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ন /
০
বিশেষ প্রতিনিধি : পেশায় তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক। স্বাভাবিক শিক্ষকতায় জীবন কাটছিল স্বাচ্ছন্দ্যে। তবে হৃদয়ে সুপ্ত ছিল মানুষের জন্য, বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করার তীব্র বাসনা। সেই তাগিদ থেকেই প্রান্তিক নারীদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন নিয়ে একদল নারীকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রেরণা’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনজিও।
শুরুর দিকে সংস্থাটি উপকূলীয় এলাকার প্রান্তিক নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মাঝে বিতরণ করা হতো স্বাবলম্বী হওয়ার নানা উপকরণ। ধীরে ধীরে ‘প্রেরণা’র সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এই সাফল্যের পথ মসৃণ ছিল না। সুনাম বৃদ্ধির সাথে সাথে তৈরি হতে থাকে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা। শম্পা গোস্বামীর এই অগ্রযাত্রা থমকে দিতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তাকে জড়িয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে শুরু করে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার চেষ্টাও চালানো হয়। এমনকি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটি মহল তার বিরুদ্ধে ‘মব ভায়োলেন্স’ (জনতা কেন্দ্রিক সহিংসতা) সৃষ্টি করে।তবে সব ষড়যন্ত্র ও বাধার দেয়াল ডিঙিয়ে অদম্য শক্তিতে এগিয়ে চলছেন শম্পা গোস্বামী।
সরোজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে শম্পা গোস্বামী ‘প্রেরণা’ এনজিও-এর অধীনে বিদেশি দাতা সংস্থার সহযোগিতায় উপকূলের অভাবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
উপকূলীয় এলাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা সুপেয় পানির তীব্র সংকট। এই সংকট নিরসনে তিনি শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে বড় পুকুর খনন করে একটি রিফাইন (পানি শোধন) প্রকল্প স্থাপন করেছেন। এর ফলে বর্তমানে শত শত পরিবার সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছে।
নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে
সাতক্ষীরা সদরের ফিংড়ীতে আজমিরা খাতুনকে বাজারে নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিনের দোকান করে দেওয়া হয়েছে।ইটাগাছায় রেশমা খাতুনকেও একইভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন শপ করে দিয়ে উদ্যোক্তা বানানো হয়েছে।
দেবহাটার পুটিমারীতে সরস্বতী নামের এক নারীকে দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন।ইটাগাছার গৃহিণী সেলিনা পারভীনকে দেওয়া হয়েছে একটি মুদি দোকান।
এভাবে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে শত শত প্রান্তিক নারীকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে প্রেরণা’।ফিংড়ীর আজমিরা খাতুন বলেন, প্রেরণা’ এনজিওর মাধ্যমে আমি স্যানিটারি ন্যাপকিনের দোকান পেয়েছি। এটি বিক্রি করে আমি যেমন লাভবান হচ্ছি, তেমনি নিজের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। নারীদের কল্যাণে ‘প্রেরণা’ সত্যিই দারুণ কাজ করছে।
দেবহাটার সরস্বতী জানান, “প্রথমে আমি সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জি কাজ শিখি। পরবর্তীতে ‘প্রেরণা’ থেকে আমাকে একটি সেলাই মেশিন দেওয়া হয়। আগে সংসারে ভীষণ অভাব-অনটন ছিল, এখন কাজ করে সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।ইটাগাছার সেলিনা পারভীন বলেন, “আমি সাধারণ গৃহিণী ছিলাম, সংসারে টানাপোড়েন লেগে থাকত। ‘প্রেরণা’ আমাকে একটি মুদি দোকান করে দেওয়ার পর এখন আমি পুরোপুরি স্বাবলম্বী। সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে, পরিবার নিয়ে ভালোভাবে দুবেলা ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারছি।শ্যামনগরের রাশিদা বলেন, “প্রশিক্ষণ নিয়ে ‘প্রেরণা’র সহায়তায় একটি টেইলার্স শপ চালু করি। এখন সেখানে আমার অধীনে আরও ৩ জন নারী কাজ করছেন। তারা সবাই এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছেন এবং পরিবারে আর্থিক অবদান রাখছেন।”
একই এলাকার মমতাজ বলেন, “আমার সংসারে সবসময় অভাব লেগে থাকত। ‘প্রেরণা’ থেকে প্রশিক্ষণ ও কাজ শুরুর উপকরণ পাওয়ার পর আমি আয় করা শুরু করি। আমার মতো শত শত নারী আজ ‘প্রেরণা’র মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী বলেন, “আমি মূলত শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু প্রান্তিক ও অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই ‘প্রেরণা’র যাত্রা শুরু করি। আজ কঠোর পরিশ্রমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র করছে। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলব আপনারা এসে আমাদের মাঠপর্যায়ের কাজ দেখুন, সুবিধাভোগী নারীদের সাথে কথা বলুন, তারপর মন্তব্য করুন। আমি শত শত নারীর মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি এবং মানুষের সেবায় আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই।
আপনার মতামত লিখুন :