সাতক্ষীরার তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রোববার (২৬ জুলাই) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা তিনটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় তিনি সেবার মান, চিকিৎসকদের উপস্থিতি, হাসপাতালের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শন শেষে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসি চুরির ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এক নিরাপত্তাকর্মীকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকেও বরখাস্ত এবং শ্যামনগরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক মেধাবী তরুণীকে চাকরির আশ্বাস দেন তিনি।
সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন তালা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. শাওলী নানজিবা তন্নি,নিরাপত্তা কর্মী মোস্তফা বিশ্বাস, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার সোহানা সেলিম। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডাক্তার আব্দুস সালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সকালে প্রথমে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে মন্ত্রী হাসপাতালের রান্নাঘর, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড, ওষুধের স্টোর, অপারেশন থিয়েটার (ওটি), চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের হাজিরা খাতা, ওয়াশরুম ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তিনি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ সরবরাহ এবং হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন।
পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, সরকারি সম্পদ রক্ষায় কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। সম্প্রতি হাসপাতালের এসি চুরির ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত মেডিকেল অফিসার ডা. শাওলী নানজিবা তন্নিকের বরখাস্ত করে ব্যাবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী হাসপাতালের চলমান সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করারও নির্দেশ দেন। বিশেষ করে ওয়াশরুমের সংস্কার ও অন্যান্য উন্নয়নকাজ নিয়মিত তদারকির কথা বলেন।
পরে বেলা ২টার দিকে তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কলেজ ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন। প্রায় এক ঘণ্টা বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসাসেবার খোঁজ নেন। এ সময় দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় চিকিৎসক সোহানা সেলিমের কে বরখাস্ত করে।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনও কম। দীর্ঘদিন চিকিৎসক নিয়োগ না হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তারপরও সীমিত জনবল নিয়ে এখানকার চিকিৎসকেরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, হাসপাতালের রান্নাঘর, বাথরুম, চিকিৎসকদের উপস্থিতি সবকিছু দেখেছি। দুজন চিকিৎসককে অনুপস্থিত থাকার কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তালা হাসপাতালে চুরির ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতালগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক। তবে উপস্থিতি ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আরও কঠোর হতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, রোস্টার ডিউটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। অনেক সময় চিকিৎসকেরা হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর করেন না। এসব বিষয়ে শৃঙ্খলা আনতে হবে। বিশেষ করে নার্সদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়। দেশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে নার্সদের উপস্থিতি কম। বিষয়টি দ্রুত ঠিক করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চিকিৎসক সংকট কাটাতে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের মাটি পরীক্ষার (সয়েল টেস্ট) কাজ শুরু হবে। সেখানে ৭ থেকে ৮ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। নতুন ভবনে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্যারালাইসিস সেন্টার, ফিজিওথেরাপি সেন্টার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা হবে।
বিকেল সোয়া ৪টার দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সেবার মান সম্পর্কে খোঁজ নেন।
পরিদর্শন শেষে শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী এলাকার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী উচ্চশিক্ষিত তরুণী শারমিন আক্তারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধায় সন্তুষ্ট হয়ে আগামী ১ আগস্ট থেকে তাকে চাকরির সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
দিনব্যাপী পরিদর্শনে পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার , জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক ডাক্তার কুদরতি খোদা, সিভিল সার্জন আব্দুস সালাম , তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন :