
শহর প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল শহীদ কাজল সরণি এলাকায় অবস্থিত নিরাময় ক্লিনিক এর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠে চলেছে। স্থানীয়দের দাবি, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের তৈরি করা একটি দালালচক্র ও মার্কেটিং কর্মচারীরা কমিশন বাণিজ্যের লোভ দেখিয়ে গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তারদের মাধ্যমে কালিগঞ্জ, শ্যামনগর, আশাশুনি থেকে দরিদ্র অসহায় ও মুমূর্ষু রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে আসে। এরপর উন্নত চিকিৎসার নামে রোগীদের জিম্মি করে হাজার হাজার টাকার ভুলভাল পরীক্ষার নিরীক্ষা করে বিল আদায় করা হচ্ছে।শুধু প্রতারণাই নয়, ক্লিনিকটির অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সুস্থ রোগীরাও আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পুরো ক্লিনিকে ময়লা আবর্জনা ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে থাকলেও পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। অভিযোগ রয়েছে, সাতক্ষীরা জেলার বাহিরে থেকে গ্রাম্য ডাক্তার এনে এমবিবিএস ডাক্তার পরিচয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং রোগীদের বিভিন্ন রোগের কথা বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করা হয়।শ্যামনগরের নীলডুমুর এলাকা থেকে আসা সিজারিয়ান রোগী খাদিজা খাতুন (৩০) তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) কথা বলে আমাকে ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে নার্স ও স্টাফরা আনাকে ভয় দেখিয়ে বলেন, দ্রুত সিজার না করলে আমি ও আমার বাচ্চা দুজনেই মারা যেতে পারি। এরপর পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে আমাকে অন্য একটি ইনটেনসিভ কেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেও ক্লিনিকের সাথে যোগসাজশ করে বাচ্চা ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে অপ্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা করিয়ে কমিশন বাণিজ্য করা হয়। আমি এই ক্লিনিক মালিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।বুধহাটার বাসিন্দা ডালিয়া খাতুন (৫৪) জানান, তাঁর মেয়ের সিজারিয়ান প্রসবের জন্য ১০ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন রকম খরচ দেখিয়ে বিল ভাউচার তৈরি করে জোরপূর্বক ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এ সময় ম্যানেজার পরিচয়ে এক ব্যক্তি বলেন আপনাদের বিল ২৫ হাজার টাকা হয়েছিল আমি কমিয়ে ২০ হাজার করেছি।নিরাময় ক্লিনিকের এমন জালিয়াতি ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা বন্ধে এটি অবিলম্বে সিলগালা করার দাবি জানান তিনি।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ক্লিনিকটিতে কোনো মানসম্মত এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত ৩ জন ডিপ্লোমা নার্স থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুপস্থিত। এছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, নারকোটিক পারমিট এবং সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লাইসেন্সের কোনো মেয়াদের বৈধতা নেই।বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সরকারি সদর হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে রোগীদের মনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে দালালচক্রের মাধ্যমে রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এই ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়।এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে নিরাময় ক্লিনিকের পরিচালক মো. তৌহিদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন আমি সাতক্ষীরার বাইরে আছি পরে কথা বলব।পরবর্তীতে আবার তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।এদিকে,সাতক্ষীরা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা Private Medical Practice and Laboratories (Regulation) Ordinance 1982-এর ৩ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠান চালানো Environment Conservation Act 1995-এর ১২ ধারা ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা Fire Prevention and Extinction Act 2003-এর ৭ ও ১২ ধারা এবং অনুমোদন ছাড়া নিয়ন্ত্রিত ওষুধ ব্যবহার Narcotics Control Act 2018-এর ৯ ও ৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডযোগ্য অপরাধ।সাতক্ষীরার এক নাগরিক নেতা ইব্রাহিম আলী বলেন অভিযোগের সত্যতা মিললে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয় বরং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংঘটিত এক মারাত্মক প্রতারণা। দ্রুত তদন্ত করে এসব অবৈধ ক্লিনিক পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটবে।এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন জানান অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে অতি দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই অভিযান চালানো হবে বলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের আশ্বস্ত করেন।
আপনার মতামত লিখুন :