
বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার শীর্ষ চোরাকারবারি, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আল ফেরদৌস আলফা সীমান্ত জনপদে এক আতঙ্কের নাম। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সাধারণ কুলি থেকে কোটিপতি বনে যাওয়া এই ব্যক্তি একাধিক মামলা ও গ্রেফতারের পরও নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে এখনও সীমান্তে তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, আল ফেরদৌস আলফা খুব ছোটবেলা থেকেই সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হন। একসময় চোরাকারবারিদের কুলি হিসেবে কাজ শুরু করলেও অতি অল্প সময়ে গড়ে তোলেন জেলা ও দেশব্যাপী বিস্তৃত এক কুখ্যাত চোরাচালান নেটওয়ার্ক।২০১৮ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ. ফ. ম. রুহুল হকের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ বাগিয়ে নেন তিনি। পরবর্তীতে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মুনসুর আহমেদের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন। সর্বশেষ, সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও পোষ্যপুত্র পরিচয়ে এলাকায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন আলফা। এই রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজ এলাকাসহ পুরো সাতক্ষীরা সীমান্তে গড়ে তোলেন নিজস্ব অপরাধ ও চোরাচালান সিন্ডিকেট।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আলফা ও তাঁর সিন্ডিকেট সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, স্বর্ণ, মাদক ও অন্যান্য মালামাল পাচার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ২০২০ সালে রিজেন্ট হাসপাতালের বহুল আলোচিত প্রতারক সাহেদ করিমকে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আলফার নাম প্রথম জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর সাতক্ষীরা শহরের কাশেমপুর বাইপাস সড়ক থেকে ৩০ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিলসহ হাতেনাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেফতার হন তিনি। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে দেবহাটায় আলফা ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানের মামলা দায়ের করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগেও একটি চোরাচালান মামলায় তাঁর ৭ বছরের সাজা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসেও একটি চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় দেবহাটা থানা পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা, সাজা এবং দফায় দফায় গ্রেফতারের পরও আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে আলফা তাঁর সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্তমানেও রাজনৈতিক পরিচয়ের দাপট দেখিয়ে এবং সীমান্ত সিন্ডিকেট সচল রেখে ভারতীয় পণ্যের অবৈধ কারবার পরিচালনা করছেন তিনি।অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আল ফেরদৌস আলফার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথম দফায় ফোন রিসিভ করে তিনি বলেন, আমি বাইরে আছি, পরে কথা বলব।তবে পরবর্তী তার বাড়ি যেয়ে বক্তব্য নেয়া চেষ্টা করা হলেও কোন সাড়া মেলেনি। সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা আবুল হোসেন বলেন,আলফা একজন দুর্ধর্ষ চোরাকারবারি। বছরের পর বছর ধরে সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত তার চোরাচালান সিন্ডিকেট। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এই দুর্ধর্ষ অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়? প্রশাসন তার অপকর্মের বিষয়ে সব জেনেও নীরব ভূমিকা পালন করছে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অবিলম্বে এই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হলে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :