বিশেষ প্রতিবেদক : সরকারি চাকরির সামান্য স্কেলকে ঢাল বানিয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-১ এ গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক সমান্তরাল সাম্রাজ্য। প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে সীমাহীন ঘুস, প্রতারণা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। অফিসের নথিপত্রে যারা পিয়ন বা সাধারণ সহকারী, প্রশাসনিক কক্ষে তারাই এখন সর্বেসর্বা। নিয়মিত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের জিম্মি করে বহাল তবিয়তে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন এই চক্রের মূল হোতারা।অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই দুর্নীতি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন পাউবো-১ এর বড়বাবু হিসেবে পরিচিত উচ্চমান সহকারী সাইফুল্লাহ এবং অফিস সহকারী মাহমুদুল হাসান। তারা গড়ে তুলেছেন অবৈধ অঢেল সম্পদের পাহাড়।আউটসোর্সিং ও দৈনিক ভিত্তিক নিরাপত্তা কর্মী ও চালকদের ঈদ বোনাস, বকেয়া বেতন এবং নিয়মিত ভাতা ছাড়ের ফাইল আটকে রেখে সরাসরি কমিশন দাবির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। টাকা না দিলে ঈদের আগেও কর্মচারীদের ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়। এছাড়া ভ্রমণ ভাতা, ভুয়া অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বিল প্রস্তুতকরণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও ছুটির প্রাথমিক ‘নোট’ তৈরির বিনিময়ে প্রকাশ্যে অর্থ লেনদেনের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন সাইফুল্লাহ। জেলা কার্যালয়ের মালামাল গোপনে বিক্রি এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।এই অনৈতিক প্রক্রিয়ায় উপার্জিত অবৈধ অর্থ দিয়ে বড়বাবু সাইফুল্লাহ শ্যামনগরের নিজ গ্রামে ১২ বিঘা জমি ও আলিশান বাড়ি তৈরি করেছেন। এছাড়া সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা বনলতা হাউজিং প্রকল্পের সামনে ৩৫ লাখ টাকা মূল্যে ৫ শতক জমি এবং নামে-বেনামে আরও সম্পত্তি কিনেছেন। অপরদিকে, অফিস সহকারী মাহমুদুল হাসান কয়রায় নিজ এলাকায় জমি ও বাড়ি করার পাশাপাশি পুরাতন সাতক্ষীরার ঘুটের ডাঙ্গী এলাকায় ২০ লাখ টাকায় ৬ শতক জমি এবং একই এলাকায় পৃথক ৩ কাঠা জমিতে বাড়ি করেছেন।অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও তাদের দৃশ্যমান বৈধ আয়ের সঙ্গে এই সুবিশাল সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পদে থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে চাকরিচ্যুতসহ ফৌজদারি কার্যবিধিতে শাস্তির স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ১৮৬০ সালের দ্য পিনাল কোড বা দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী ঘুস গ্রহণ এবং ১৬৭ ধারা অনুযায়ী ভুয়া প্রশাসনিক নথি বা বিল তৈরির দায়ে কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।একইসঙ্গে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অনুসারে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভবান হওয়ার অপরাধ প্রমাণের পাশাপাশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান বিস্তৃত। এছাড়া অবৈধ উপায়ে জমি ও বাড়ি কেনার এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা অর্থাৎ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।প্রশাসনিক এই বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ে নাগরিক নেতা আবুল হাসান বলছেন সমাজের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে এই চক্রকে আইনের আওতায় এনে বিভাগীয় তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
আপনার মতামত লিখুন :