
* স্বাভাবিকের তুলনায় তিনগুণ বিল আদায়।
* সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ।
* ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় বারবার রোগীর মৃত্যু।
* রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
নিজস্ব প্রতিবেদক : সাতক্ষীরা হার্ট ফাউন্ডেশন সময়ে-অসময়ে খবরের পাতায় উঠে আসা একটি বিতর্কিত নাম। কখনো সাধারণ রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত বিল আদায় ও মারধর, আবার কখনো ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় শিরোনাম হয় প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি স্বাস্থ্য নীতিমালা সম্পূর্ণ অমান্য করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মাত্র ৫০ মিটারের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে এই ক্লিনিকটি।ক্লিনিকটির মালিক সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফয়সাল আহমেদ। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ক্ষমতার সাইনবোর্ড বদলে ফেলেন এই চিকিৎসক। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবু আহমেদ ছিলেন এই ক্লিনিকের উপদেষ্টা। তার মাসোহারা ও ক্ষমতার বলয়ে চলত ক্লিনিকের সব অবৈধ কর্মযজ্ঞ।ডাঃ ফয়সালের বিরুদ্ধে স্থানীয় সিভিল সার্জনদের জিম্মি করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সাতক্ষীরায় পদায়ন হওয়া সিভিল সার্জনদের বাধ্য করা হতো তাঁর ক্লিনিকে রোগী দেখতে। কথা না শুনলে নারী ও মদ দিয়ে ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইল করা হতো তাঁদের। সম্প্রতি বর্তমান সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালামের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ডাঃ ফয়সালের নির্দেশ না মানায় তাকে মদ ও নারী দিয়ে ফাঁসিয়ে ভাড়াটে লোক দিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করানো হয় তাঁর অপসারণের দাবিতে। পরবর্তীতে ঘটনাটি জানাজানি হলে এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে ডা. ফয়সালকে চুয়াডাঙ্গায় বদলি করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি পুনরায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান নিশ্চিত করেন। সাধারণ অসহায় মানুষের রক্ত চুষে টাকা উৎপাদনের এই ক্লিনিক ছাড়তে চান না বলেই তিনি সাতক্ষীরার বাইরে চাকরি করতে অনিচ্ছুক।অন্যদিকে, ডা. ফয়সালের নির্যাতনের শিকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. রুস্তম ফরাজী গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাকে নারী দিয়ে ফাঁসিয়ে গোপনে ভিডিও করে রাখা হয়েছিল। সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে তাঁর ক্লিনিকে রোগী দেখতে বাধ্য করেছিলেন ডা. ফয়সাল। নিরুপায় হয়ে তৎকালীন সময়ে তার সব অনৈতিক দাবি আমাকে মেনে নিতে হয়েছিল।গরীব রোগীদের সর্বস্বান্ত করে অনিয়মবহির্ভূত বিল আদায়ের জন্য ডা. ফয়সালের অধীনে রয়েছে জেলাজুড়ে বিস্তৃত এক দালালচক্র। গ্রাম্য ডাক্তার ও দালালরা রোগী পাঠালে মোটা অঙ্কের কমিশন পান, যা পরবর্তীতে সুচতুরভাবে রোগীর বিলে যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০-১২ জনের একটি সক্রিয় দালালচক্র নিয়োজিত থাকে। কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকা থেকে আসা অসহায় রোগীদের ভালো চিকিৎসার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি করায় তারা। রোগী ভর্তি করিয়ে নিজেদের কমিশন নিয়ে সটকে পড়ে এরা, পরে আর ওদের খোঁজ মেলে না।প্রাপ্ত তথ্যসূত্রে দেখা যায়, গত এক বছরেই সাতক্ষীরা হার্ট ফাউন্ডেশনে ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলায় ৪ থেকে ৫ জন রোগী মারা গেছেন। মৃত্যুর পর রোগীর স্বজনদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার এবং সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে জোরপূর্বক আপসনামায় স্বাক্ষর করিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়।শুধু তাই নয়, রোগী ও তাদের স্বজনদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। গত বছরের ৯ নভেম্বর দুপুরে কাটিয়া আমতলায় ডা. ফয়সাল আহমেদের নিজ বাড়িতে সিরিয়াল না মেনে রোগী দেখার প্রতিবাদ করায় কলারোয়া উপজেলার শাকদাহ এলাকার বিউটি বেগম (৫৫) নামে এক নারী রোগীকে জুতা দিয়ে পেটায় এবং কান ধরে ওঠবস করায় ডা. ফয়সাল। এমনকি মাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে ওই নারীর মেয়েও শ্লীলতাহানির শিকার হন।সাতক্ষীরা মেডিকেল চিকিৎসা নিতে আসা কালিগঞ্জের বন্দকাটি নুরুল ইসলাম বলেন,দুর্বৃত্তদের হামলায় মাথায় আঘাত পেয়ে আমি সাতক্ষীরা মেডিকেলে গিয়েছিলাম। সেখানে এক দালাল ফুসলিয়ে আমাকে হার্ট ফাউন্ডেশনে নিয়ে আসে। সামান্য একটি অপারেশনের জন্য এক রাতে ৩৭ হাজার টাকা বিল করে। দুই দিন রেখে বেড ভাড়া ও সার্ভিস চার্জসহ মোট ৫৩ হাজার টাকা আদায় করে। ঘরের গরু বিক্রি করে সেই বিল মেটাতে হয়েছে। ডা. ফয়সাল চিকিৎসার নামে কসাইয়ের মতো আচরণ করেন, টাকা ছাড়া কিছু বোঝেন না। গরীবের রক্ত চুষে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।”এদিকে আরেকভুক্তভোগী শ্যামনগরের রমজানগর আব্বাস ফয়েজ বলেন,হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে আমি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই। পরে সুব্রত নামের এক দালাল (পরে জানতে পারি সে হার্ট ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার) উন্নত চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে আমাকে হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি করায়। ৬ দিন থাকার পর ৪৫ হাজার টাকা বিল ধরিয়ে দেয়। প্রতিবাদ করতে গেলে বহিরাগত গুন্ডা এনে মারধর করতে আসে। বাধ্য হয়ে জামাইয়ের সুদে নেওয়া টাকায় বিল মেটাতে হয়েছে। আমরা অসহায়, আল্লাহর কাছে বিচার দেওয়া ছাড়া পথ নেই।জেলা নাগরিক নেতা আবুল হাসান বলেন, “হার্ট ফাউন্ডেশন রোগীদের পকেট ও গলা কাটে কথাটি নির্মম সত্য। ডাঃ ফয়সাল অত্যন্ত প্রভাবশালী তিনি প্রতিটা সরকারের আমলেই রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে ক্লিনিক চালান। আমরা চাই স্বাস্থ্যনীতিমালা অমান্য করে গড়ে ওঠা এই অবৈধ ক্লিনিকটি অনতিবিলম্বে বন্ধ করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ তার হাত থেকে রক্ষা পায়।অভিযুক্ত হার্ট ফাউন্ডেশনের স্বত্বাধিকারী ডাঃ ফয়সাল আহমেদ কাছে তার ক্লিনিকে বার বার রোগী মারা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নিউজ করার জন্য ইস্যু তৈরি করছেন, আমি এখন ব্যস্ত”এ কথা বলে তিনি ফোন কেটে দেন।সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডাঃআব্দুস সালাম বলেন, হার্ট ফাউন্ডেশন বিতর্কিত মানুষের গলাকাটা বিল করে কথাটি সত্য। সে আমাকে জিম্মি করে, নারী ও মদ দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বহিরাগতদের দিয়ে মানববন্ধন করায় আমার অপসারণের দাবিতে। আমি শাস্তি হিসেবে তাকে মেহেরপুরে বদলি করি। পরে সে আবার তদবির করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে আসে। আমি অভিযোগ পেলে হার্ট ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”সাতক্ষীরা আইন বিশেষজ্ঞরা হার্ট ফাউন্ডেশন ও ডা. ফয়সাল আহমেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ পর্যালোচনা করে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ প্রচলিত আইন অনুযায়ী এগুলো অত্যন্ত গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।অবহেলাজনিত ভুল চিকিৎসা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি , ১৮৬০ এর ধারা ৩০৪ অবহেলা বা বেপরোয়া কাজের মাধ্যমে কারো মৃত্যু ঘটালে তা অবহেলাজনিত নরহত্যা হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড।ধারা ৩৩৬, ৩৩৭ ও ৩৩৮: অন্যের জীবন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন করা এবং চরম অবহেলায় গুরুতর জখম করার অপরাধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধারা ৪২০ দালালচক্রের মাধ্যমে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল আদায় ও প্রতারণার অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।ধারা ৩৮৪ ও ৩৮৫ সরকারি কর্মকর্তা/সিভিল সার্জনদের নারী ও মদ দিয়ে ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইল করা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করা দণ্ডনীয় অপরাধ, যার শাস্তি ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।মারধর, শারীরিক নির্যাতন ও নারীর শ্লীলতাহানি দণ্ডবিধি ধারা ৩২৩ রোগী বা তাঁর স্বজনদের মারধর করার জন্য ১ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা। ধারা ৩৫৪ কোনো নারীর শ্লীলতাহানি বা অসম্মান করার উদ্দেশ্যে হামলা বা বলপ্রয়োগ করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে।চিকিৎসা নীতি লঙ্ঘন ও অবৈধ ক্লিনিক পরিচালনা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ (ধারা ২৩ ও ২৮ কোনো চিকিৎসক যদি পেশাগত চরম অসদাচরণ দালাল নিয়োগ বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সাথে যুক্ত থাকেন, তবে বিএমডিসি তাঁর চিকিৎসা সনদ/রেজিস্ট্রেশন সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাতিল করতে পারে।মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২ সরকারি হাসপাতালের ৫০ মিটারের মধ্যে বেসরকারি ক্লিনিক স্থাপন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। লাইসেন্স বাতিলসহ ক্লিনিক সিলগালা এবং মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।সাতক্ষীরা ভোক্তা অধিকার বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ ধারা -৪৫ ও ৫২/৫৩ সেবার নামে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, প্রতারণা, চরম অবহেলা এবং নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা দণ্ডনীয় অপরাধ, যার জন্য জরিমানা ও জেল হতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :