তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাইলে তালা ইউএনও তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ
News Desk (S)
প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১০, ২০২৬, ৮:২০ অপরাহ্ন /
০
স্টাফ রিপোর্টার: তথ্য অধিকার আইনে তথ্য উপাত্ত চেয়ে আবেদন করিলে অভ্যন্তরীণ গোপনীয় অজুহাতে তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ তালা ইউএনও’র বিরুদ্ধে ।
তথ্য সূত্রে: সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, আর্থিক অসঙ্গতি, অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অভিযোগ তদন্তের বদলে অভিযোগের জবাব গোপন রাখা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকে প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কাছে লিখিত জবাব চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের কাছে লিখিত জবাবও দেন। এরপর অভিযোগকারী ও বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য এম একরামুল হক আসাদ তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ওই জবাবগুলোর তথ্য চেয়ে আবেদন করিলে ইউএনও তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে লিখিত জবাব দেন এটি বিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ বিষয়। তাহলে তথ্য গোপনের মূল রহস্য কি ?
অভিযোগের ভিত্তিতে যখন সরকারি প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত জবাব নেয়, তখন সেই জবাব কি নিছক বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নথি, নাকি অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ?
অভিযোগ থেকে প্রশাসনিক জবাব
ইউএনও বরাবর দেওয়া অভিযোগে এম একরামুল হক আসাদ দাবি করেন, বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগে বিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক আতিয়ার রহমানকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়,
এ ধরনের বিরোধ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষের জানালার কাঁচ দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি এবং শীতকালে ঠান্ডা বাতাস শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করায় শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগের মধ্যে পাঠ গ্রহণ করছে। শ্রেণিকক্ষের পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণেও অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য খাতে অর্থ আদায় করা হলেও বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে না।
অভিযোগকারী এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয় ও উন্নয়ন খাতের ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
১৫ জনের লিখিত জবাব, এরপরই তথ্যের প্রশ্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কাছে লিখিত জবাব চাওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা ইউএনওর কাছে লিখিত জবাব দাখিল করলে
বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
অভিযোগকারী এম একরামুল হক আসাদ ওই লিখিত জবাবগুলোর ফটোকপি চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন। তাঁর যুক্তি—তিনি নিজেই অভিযোগকারী; তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রশাসন জবাব চেয়েছে; ফলে অভিযোগের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য কী ছিল, তা জানার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
কিন্তু তাঁর দাবি, ইউএনও কার্যালয় থেকে তাঁকে জানানো হয়, এসব তথ্য বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও গোপনীয় বিষয়। প্রশাসনের কাছে দাখিল করা একটি লিখিত জবাবে কীভাবে শুধু বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়? থাকলে তথ্য অধিকার আইনে কী বলা আছে?
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় ‘তথ্য’ বলতে সরকারি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি, চিঠি, প্রতিবেদন, হিসাবসহ বিভিন্ন ধরনের দলিলকে বোঝানো হয়েছে। একই আইনে নাগরিকের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে।
তবে সব তথ্য প্রকাশযোগ্য নয়। আইনটির ধারা ৭-এ নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির তথ্য প্রকাশ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিধান রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো বিচারাধীন বিষয় বা আইনে নির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত তথ্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হতে পারে। তথ্য কমিশনের একটি সিদ্ধান্তেও ধারা ৭-এর নির্দিষ্ট বিধান প্রয়োগ করে তথ্য না দেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ফলে কোনো তথ্যকে শুধু ‘গোপনীয়’ বা ‘অভ্যন্তরীণ’ আখ্যা দিলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য অধিকার আইনের আওতার বাইরে চলে যায় কি না—এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে চাহিত নথিটি আইনের ধারা ৭-এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে কি না, তার ওপর।
‘বিদ্যালয়ের নয়, বিষয়টি এখন প্রশাসনের’ অভিযোগকারী এম একরামুল হক আসাদ বলেন, “আমি বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও অনিয়ম নিয়ে আমি ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেছি। আমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী ইউএনওর কাছে লিখিত জবাব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “তাহলে ওই লিখিত জবাব এখন শুধু বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ গোপনীয় বিষয়—এ কথা কীভাবে বলা হয়? আমি তো বিদ্যালয়ের কোনো ব্যক্তিগত নথি চাইনি; প্রশাসনের কাছে দাখিল হওয়া জবাবের কপি চেয়েছি।”
আসাদের অভিযোগ, তাঁর অভিযোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা তাঁর ভাষায় ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ কিছু বক্তব্য ওই জবাবে থাকতে পারে—এ কারণেই বিষয়টি প্রকাশ না করার চেষ্টা হচ্ছে।
আসাদের অভিযোগ, “আমার চাহিত তথ্য না দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের রক্ষায় ভূমিকা রাখা হচ্ছে।
তবে তাঁর এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আয়-ব্যয়ের হিসাবও কি খতিয়ে দেখা হয়েছে?
বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব কি প্রশাসনিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে?
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত মাসিক বেতন, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য অর্থের পরিমাণ, ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, রসিদ, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয়, উন্নয়ন ও সংস্কার খাতে অর্থ ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন—এসব নথি যাচাই করলেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বাস্তবতা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
বিশেষ করে অভিযোগে যখন শ্রেণিকক্ষের জানালার কাঁচ ভাঙা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সমস্যার কথা বলা হয়েছে, তখন বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অর্থ ব্যয়ের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
টাকা আদায় হয়েছে কত, খরচ হয়েছে কোথায়—এই হিসাবই হতে পারে অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা।
জবাব প্রকাশ পেলেই কি সমস্যা?
অভিযোগের পর শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রশাসনের কাছে যে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন, তার কপি প্রকাশ বা সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নির্দিষ্ট আইনি কারণ উল্লেখ করা—এমন প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
কারণ, তথ্য অধিকার আইনের মূল কাঠামো তথ্য পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, আবার একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য প্রকাশে ব্যতিক্রমও রেখেছে। ফলে ‘গোপনীয়’ শব্দটি ব্যবহার করার পাশাপাশি কোন আইনি বিধানের আওতায় তথ্যটি অব্যাহতি পাচ্ছে—তা স্পষ্ট করা হয়েছে কি না, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য কমিশনের সরকারি নথিতেও দেখা যায়, কোনো তথ্য না দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি বিধান প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
তদন্ত হবে, নাকি ফাইলেই আটকে থাকবে?
বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। একইভাবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ শিক্ষক-কর্মচারী কী জবাব দিয়েছেন, সেটিও প্রকাশ্যে না আসায় তাঁদের বক্তব্যের বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তাই অভিযোগকারীর দাবি যেমন তদন্তের দাবি রাখে, তেমনি অভিযুক্তদের বক্তব্যও সমানভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর লিখিত জবাব নিল। তারপর সেই জবাবের কপি চেয়ে অভিযোগকারী তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলেন।
কিন্তু তাঁকে বলা হলো—এটি ‘অভ্যন্তরীণ গোপনীয় বিষয়’।
তাহলে প্রশ্ন হলো—অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনের কাছে জমা পড়া জবাবের আইনগত অবস্থান কী? কোন ধারায় তা গোপনীয় এবং বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আয়-ব্যয়ের নথি পরীক্ষা করা হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং তথ্য গোপনের বিতর্ক—দুটিই অনিষ্পন্ন থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে এবং তথ্য অধিকার আইনের বিধান অনুসারে চাহিত তথ্য প্রদানের বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানাবে।
কারণ, বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় স্বার্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়—শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছ শিক্ষার পরিবেশ।
আপনার মতামত লিখুন :