
বর্তমান সাতক্ষীরা ডেস্ক : ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শেষ হলেও শেষ হয়নি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ডাঃ মোঃ মুরাদ হোসেনের (ডিভিএম, বাকৃবি) ছুটি! সরকারি হাসপাতালের চেয়ার খালি রেখে নিজের ইচ্ছামতো কর্মস্থলে আসার দাম্ভিকতা এবং হাসপাতালে পশুদের জীবনরক্ষাকারী সরকারি ওষুধ ও ভ্যাকসিন বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার মতো গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বর্তমান সাতক্ষীরা পত্রিকার সাংবাদিক টিমের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই চিকিৎসকের ভয়াবহ দুর্নীতি, অনিয়ম ও সাধারণ খামারিদের সাথে অপেশাদার আচরণের চাঞ্চল্যকর চিত্র।সরেজমিনে জানা যায়, কলারোয়া ও আশেপাশের এলাকা থেকে একাধিক ব্যক্তি তাদের গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল ও বিদেশি কুকুর নিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে দায়িত্বরত ভেটেরিনারি সার্জন ডাঃ মোঃ মুরাদ হোসেনকে পাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীরা তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, “ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শেষ হলেও আমার ছুটি এখনও শেষ হয়নি। আমার সুবিধামতো আমি হাসপাতালে আসব।” এ নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে তিনি আরও বলেন, “আমার হাত অনেক লম্বা, আপনাদের যা মন চায় তাই করেন, আমার কাউকে গোনার সময় নাই।” একজন সরকারি কর্মচারীর মুখে এমন ভাষা শুনে হতবাক স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও খামারিরা।কলারোয়ার স্থানীয় বাসিন্দা রহিম গাজী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার গরুর চিকিৎসার জন্য পশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাঃ মোঃ মুরাদ হোসেনকে পাওয়া যায় না। উপরন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো সরকারি ওষুধ না দিয়ে বলা হয় বাইরে থেকে কিনে নিয়ে আসতে। চিকিৎসা নিতে গেলে উনি সাধারণ মানুষের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন।অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কলারোয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে পশু চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ সরকারি ওষুধ, লাইভস্টক ভ্যাকসিন এবং ইনজেকশন বরাদ্দ আসে, তা ডাঃ মুরাদ হোসেন সরকারি খাতায় ভুয়া বণ্টন দেখিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন। হাসপাতালে আসা দরিদ্র খামারিদের বরাবরের মতোই ফিরিয়ে দিয়ে বলা হয়, “সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই, ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনেন।”এদিকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১ জুন, ২০২৬ তারিখে দেশব্যাপী “বিশ্ব দুগ্ধ দিবস” (World Milk Day) যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের কথা থাকলেও কলারোয়া উপজেলা হাসপাতালে তা পালন করা হয়নি। সরকারি কর্মসূচিকে এভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোয় স্থানীয় ডেইরি খামারিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ডাঃমোঃ মুরাদ হোসেনের গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য তার মুঠোফোনে ফোন দিবো জানতে পেরে মুঠোফোনটি আগে থেকে বন্ধ করে রাখেন। আইনজীবীদের মতে, ডাঃ মোঃ মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন এবং সরকারি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ ও চুরি (দণ্ডবিধি, ১৮৬০)সরকারি ওষুধ ও ভ্যাকসিন বাইরে বিক্রি বা চুরি করা দণ্ডবিধির (Penal Code, 1860) ৪০৯ ধারা (সরকারি কর্মচারী দ্বারা বিশ্বাসের অপরাধমূলক ভংগ বা Criminal Breach of Trust) অনুযায়ী একটি চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।সরকারি চাকরি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮” এর ৩ (খ) ধারা অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং সরকারি দিবস পালন না করা “অসদাচরণ” (Misconduct) এবং “অদক্ষতা” (Inefficiency)-র শামিল। এর শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতি, এমনকি চাকরি থেকে চূড়ান্ত বরখাস্ত (Dismissal) হতে পারে।জনগণের সেবক হয়ে সাধারণ মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করা এবং “হাত অনেক লম্বা” বলে হুমকি দেওয়া দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর আওতাভুক্ত ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল, যা বিভাগীয় মামলা ও শাস্তির অন্যতম কারণ।কলারোয়ার সাধারণ খামারি সহ একাধিক নাগরিক নেতা ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অপসারণ এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :