
* ঘুষের কারণে সদর থেকে বদলি
* রয়েছে নামজারি দালাল সিন্ডিকেট
* ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার
*গভীর পরকীয়ায় আসক্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক : কথায় আছে ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’ আর ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’প্রবাদ দুটির সত্যতা মিলেছে সাতক্ষীরার বহুল আলোচিত ও শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকারের ক্ষেত্রে।সাতক্ষীরা জেলার আলোচিত নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের ঘুষ বাণিজ্য কোনোভাবেই থামছে না। ঘুষের টাকার লোভ সামলাতে না পেরে বারবার কেলেঙ্কারিতে ফেঁসেছেন তিনি। শর্মিষ্ঠা সরকারের চতুর মুখোশের আড়ালে রয়েছে ভয়ংকর এক রূপ। ঘুষ কেলেঙ্কারির কারণে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠলে তড়িঘড়ি করে তাঁকে ফিংড়ীতে বদলি করা হয়। তবে ফিংড়ীতে গিয়েও তাঁর ঘুষ বাণিজ্য থেমে নেই। ফিংড়ী কার্যালয়ে যোগদানের প্রথম দিনেই অফিস সহকারী ও নামজারি দালাল চক্রকে নিয়ে নতুন একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সেখানেই রফা হয় ঘুষের টাকার হিসাব-নিকাশ। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি নামজারির জন্য শর্মিষ্ঠাকে দিতে হবে ২ হাজার টাকা। ২ হাজার টাকার কম হলে ফাইল সার্ভারে আপডেট হবে না, নামজারিও হবে না। নামজারি দালাল চক্রের দাবি, পূর্বে নায়েবরা ১ হাজার টাকা পেতেন, তবে ২ হাজার টাকা দিলে তাদের চাপ বেশি হয়ে যায়। কিন্তু শর্মিষ্ঠা সরকার ক্ষুব্ধ হয়ে জানান, ২ হাজার টাকার এক পয়সাও কম হবে না। একপর্যায়ে দালাল চক্র তাঁর প্রস্তাবে সায় দেয়।সরেজমিন অনুসন্ধানে সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসে গিয়ে জানা গেছে, নামজারির প্রতিবেদনের জন্য ৬ হাজার টাকা, খাজনা দাখিলার জন্য ১ হাজার টাকা এবং ইজারাসহ ঝামেলাপূর্ণ জমিতে লাখ টাকা বাগিয়ে নেন তিনি। সকল ফাইলে সেবাগ্রহীতাদের টেবিল টেবিলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত ঘুষের টাকা গুনতে হয়।সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসে থাকাকালীন তিনি নিজেই গড়ে তুলেছিলেন নামজারি দালাল সিন্ডিকেট। তৎকালীন এসিল্যান্ডের সাথে তিনি গভীর সখ্য গড়ে তোলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, তৎকালীন এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজা নিজেই দুর্নীতির একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন, যার প্রধান সেনাপতি হিসেবে কাজ করতেন সদর ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার। তিনিই মূলত এই দুর্নীতি চক্রের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রথমে কোনো সেবাগ্রহীতা আসলেই এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাঁকে ঘিরে ধরতেন। এরপর সেই সেবাগ্রহীতাকে নিয়ে যাওয়া হতো নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে। প্রথমে বিভিন্ন অহেতুক যুক্তি দেখিয়ে ফাইল ঘোরাতে থাকতেন তিনি। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ঘুষের টাকায় চুক্তিবদ্ধ হতে হতো নায়েব শর্মিষ্ঠার সাথে। শর্মিষ্ঠার চাহিদা মোতাবেক টাকা পেলেই ফাইলের কাজ এগোতো। নায়েব শর্মিষ্ঠার সবুজ সংকেত মিললেই মিলতো এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর। ভুক্তভোগীদের নিকট থেকে অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।তাছাড়া এসিল্যান্ডের সাথে নায়েব শর্মিষ্ঠার ঘনিষ্ঠতার কারণে তাঁকে সার্বক্ষণিক এসিল্যান্ডের কক্ষ ও গাড়িতে দেখা যেত। শুধু প্রশাসনিক ঘনিষ্ঠতাই নয়, নায়েব শর্মিষ্ঠা এক স্থানীয় সাংবাদিকের সাথে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই সাংবাদিক ও শর্মিষ্ঠার অডিও কল রেকর্ড এবং অন্তরঙ্গ মুহূর্তের নানা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে আসে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে নায়েব শর্মিষ্ঠা ওই সাংবাদিকের কাছ থেকে দামি উপহারসামগ্রীসহ নগদ অর্থ হাতিয়ে নেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তাদের এই প্রেমের ঘটনায় জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।ভুক্তভোগী ফিংড়ীর মনিরুল ইসলাম মাসুম বলেন, “নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার ১৪৫ ধারার একটি রিপোর্টের জন্য ২ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু রিপোর্ট প্রদান না করে তালবাহানা করে ঘোরাতে থাকেন। তিনি জেলার অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিবাজ। দুর্নীতির দায়ে বদলি হলেও কোনো লজ্জা নেই, ফিংড়ীতে এসেও একই কাণ্ড চালাচ্ছেন। ঘুষের টাকা নিচ্ছেন কিন্তু কাজ না করে ঘোরাচ্ছেন।অপর ভুক্তভোগী জাফর জানান, আগরদাড়ী ইউনিয়নের কাশেমপুর মৌজায় আমাদের একটা জমি নিয়ে ঝামেলা চলছিল। নায়েব শর্মিষ্ঠা তখন আগরদাড়ী ভূমি অফিসে কর্মরত। আমি নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে গেলে তিনি ৩ হাজার টাকা দাবি করেন। আমি ৩ হাজার টাকা দিলেও সে টাকা নিয়ে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বেশি টাকা পেয়ে আমার বিপক্ষে রিপোর্ট দেন। সে নিরপরাধ মানুষের থেকে মুখোশের আড়ালে ডাকাতি করে ঘুষের টাকা আদায় করেন।আরেক ভুক্তভোগী ফিংড়ীর আলামিন হোসেন বলেন, “৫-৬ দিন আগে ফিংড়ী ভূমি অফিসে নামজারির জন্য আমি আর আমার মা যাই। সেখানে গেলে এক দালাল আমার কাছে ৭ হাজার টাকা চায় সবকিছু সম্পন্ন করে দেওয়ার জন্য। আমি দালালের কথায় পাত্তাই না দিয়ে সরাসরি নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে গেলে তিনিও একই কথা বলেন। নায়েব শর্মিষ্ঠা বলেন, ‘অফিসের খরচাপাতি দিন, আপনার নামজারি হয়ে যাবে।’ পরে তিনি ওই দালালের কাছে যেতে বলেন। বাধ্য হয়ে সেই দালালের কাছে যাই এবং চুক্তি মোতাবেক ৭ হাজার টাকা দিই। এই মহিলা এসেছেন ফিংড়ীর নিরীহ মানুষের রক্ত চুষে খেতে।অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তাঁর ব্যবহৃত দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :