মরা মুরগি ও পচা মাংসের আখড়া সোনারগাঁ রেস্তোরায়: প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই চলছে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি!


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুলাই ১৪, ২০২৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন /
মরা মুরগি ও পচা মাংসের আখড়া সোনারগাঁ রেস্তোরায়: প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই চলছে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি!

বর্তমান সাতক্ষীরা ডেস্ক : খাবারের নামে বিষ খাইয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে সোনারগাঁ রেস্তোরা এন্ড সুইটস।এক সময়কার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরার খোলস পাল্টে প্রতিষ্ঠানটি এখন পরিণত হয়েছে পচা ও রোগাক্রান্ত মাংসের কারখানায়। একের পর এক ভুক্তভোগীর ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতার তথ্যে বেরিয়ে আসছে এই রেস্তোরার নেপথ্যের অন্ধকার ইতিহাস ও নোংরা কারবারের চাঞ্চল্যকর সব কাহিনী।অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোনারগাঁ রেস্তোরার বর্তমান মালিক এক সময় বড় বাজারে অন্য একজনের দোকানে সাধারণ কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। সেই সময়েই বড় বাজারের খুচরা হাঁস ও মুরগি ব্যবসায়ীদের সাথে তার একটি বিশেষ সখ্যতা ও সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। রেস্তোরার মালিক হওয়ার পরও তিনি সেই পুরনো নোংরা সম্পর্ককে কাজে লাগাচ্ছেন।অভিযোগ রয়েছে, খুচরা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রাম ও মহল্লা থেকে রোগাক্রান্ত ও মরা মুরগি এবং পোল্ট্রি খামার থেকে মরণব্যাধি ‘গামবোরো’ রোগে আক্রান্ত মুরগি নামমাত্র মূল্যে সংগ্রহ করে এই সোনারগাঁ হোটেলে সরবরাহ করে। আর রেস্তোরা কর্তৃপক্ষ সেইসব রোগাক্রান্ত সোনালী মুরগিকে ‘দেশি মুরগি’ বলে চড়া দামে সাধারণ গ্রাহকদের পাতে তুলে দিয়ে প্রতারণা করে আসছে।রেস্তোরাটিতে খেতে গিয়ে চরম প্রতারণা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছেন একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা। ভুক্তভোগী মোঃ আলী হাসান সাঈদ তার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “ওদের খাবারের মান এতই খারাপ যে কিছু দিন আগে খেতে গিয়েছিলাম। আমাকে বাসি  মুরগির মাংস দেওয়া হলো। একটু মুখে দিয়েই বললাম, ভাই টক লাগে কেন? ওরা বল্লো সস দিয়ে রান্না, তাই টক লাগছে। তারপর বললাম গন্ধ কেন? কোনো সদুত্তর না দিয়ে উল্টো খাসির মাংস এনে বলে এটা খেয়ে দেখেন।​আরেক ভুক্তভোগী কাজী প্রান্ত অনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সোনারগাঁ রেস্তোরা আরও ৩-৪ বছর আগে থেকেই ডাস্টবিন হয়ে গেছে। পথচারী ছাড়া স্থানীয় সচেতন কোনো মানুষ এখন আর ঐ হোটেলে কিছু খায় না।শুধু মুরগি বা খাসি নয়, বাসি ও পচা মাছ খাওনোর অভিযোগও উঠেছে এই হোটেলের বিরুদ্ধে। গৌতম মন্ডল নামের এক গ্রাহক জানান, “আমি কিছুদিন আগে একটা ভেটকি মাছ খেলাম। দেখলাম মাছটা প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। বারবার বলা সত্ত্বেও তারা মাছ পরিবর্তন করে দিল না, উল্টো দাবি করল আজকেই রান্না করা। বাধ্য হয়ে মাছ রেখে শুধু ভাত খেয়ে চলে এলাম। টাকা দেওয়ার সময় কিছু বলতে গেলে ৪০ টাকা কম রাখল। তার মানে পচা মাছের দাম বাবদ ১২০ টাকাই পকেট থেকে দিতে হলো আমায়। স্থানীয় সবার সাবধান হওয়া উচিত।”আরেক ভুক্তভোগী রাজু জানান আরও গা শিউরে ওঠা তথ্য। তিনি বলেন, “শুধু তাই নয়, মুরগির মাংস বাসি হওয়া ও পোকা ধরা গ্রিলও মানুষকে খাওয়ায় তারা। আমি নিজেই এর ভুক্তভোগী। খাবারে পোকা দেখিয়ে অভিযোগ করলে হোটেলের স্টাফরা আঙুল দিয়ে চেপে ধরে বলে কই কিছু না! আমি এর সঠিক তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।শুধু এখানেই শেষ নই, রাতের আঁধারে রোগাক্রান্ত ও মরণাপন্ন ছাগল কিনে জবাই করে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখা এবং সেই পচা-দুর্গন্ধযুক্ত মাংস ক্রেতাদের পাতে তুলে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠেছে এই বিতর্কিত সোনারগাঁ রেস্তোরার বিরুদ্ধে।১১ জুলাই, বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিন জন ক্রেতা। রেস্তোরাটিতে গিয়ে তারা বিকালের খাবারের খোঁজ নেন এবং একপর্যায়ে ‘খাসির লটপটি’ অর্ডার করেন। কিন্তু খাবার মুখে দেওয়া মাত্রই আসে চরম ধাক্কা। খাসির মাংসের পরিবর্তে তাদের মুখে লাগে পৌরসভার ডাস্টবিনের মতো তীব্র পচা ও ভ্যাপসা গন্ধ।তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি রেস্তোরা কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে, তারা চরম উদাসীনতা দেখান এবং ক্রেতাদের অভিযোগ পুরোপুরি এড়িয়ে যান। ভুক্তভোগীদের দাবি, রেস্তোরাটি সুকৌশলে কম দামে রোগাক্রান্ত মেয়ে ছাগল (বকরি) কিনে রাতের অন্ধকারে জবাই করে এবং সেই বিষাক্ত মাংস দিনের পর দিন ফ্রিজে জমিয়ে রেখে সাধারণ মানুষকে খাওয়াচ্ছে।সোনারগাঁ রেস্তোরার এই নোংরা কারবার আজকের নতুন নয়। ডিসি অফিস  সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও এই রেস্তোরায় একাধিকবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছিল। সেইসব অভিযানেও ফ্রিজ থেকে বিপুল পরিমাণ পচা, বাসি এবং অস্বাস্থ্যকর মাংস জব্দ করা হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের জরিমানাসহ সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের সেই চপেটাঘাতের পরও স্বভাব বদলায়নি এই অসাধু চক্রের। এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সোনারগাঁ রেস্তোরা এন্ড সুইটসের ম্যানেজার বলেন ভাই আপনি দয়া করে নিউজটা করেন না। কিছুক্ষণ পরে সোনারগাঁ রেস্তোরার মালিক পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন দিয়ে বলেন সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য।এদিকে,সাতক্ষীরা  ​ভোক্তাঅধিকার ও নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর বলেন, সোনারগাঁ রেস্তোরা এন্ড সুইটস যা করছে, তা দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাদের এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমরা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩, ​ধারা ২৮ অনুযায়ী জেনেশুনে পচা, বাসি, রোগাক্রান্ত পশুর মাংস বা অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি করে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।এই অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৬ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে আমাদের । অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে, আমরা অভিযান  পরিচালনার ব্যবস্থা করছি।প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে রোগ ছড়ানোর এই ‘কসাইখানা’ অবিলম্বে বন্ধ করা হোক। বারবার অপরাধ করার পরও কেন এই সোনারগাঁ রেস্তোরাঁকে চিরতরে সিলগালা করা হচ্ছে না, তা নিয়ে এখন ক্ষোভ দানা বাঁধছে স্থানীয় সচেতন মহলে। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর অভিযান দাবি করছেন।