* নামজারি ৭ হাজার টাকা।
* ঝামেলাপূর্ণ জমিতে লাখ টাকার দরকষাকষি।
* হানিফের নামজারিতে ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ।
নিজস্ব প্রতিবেদক : সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিস দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। ঘুষ ছাড়া কোনো কালেই মিলত না সেবা। সাধারণ গ্রাহক থেকে প্রভাবশালী প্রত্যেককে দেওয়া লাগত ঘুষের টাকা। ভদ্রবেশী সদর এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজা ও মাস্ক লেডি নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল ঘুষের অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট। এই ঘুষের সিন্ডিকেট মাঠপর্যায়ে সমঝোতা করত উপ-ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রনি কুমার পাল। বদরুদ্দোজা-শর্মিষ্ঠার নিয়ন্ত্রণাধীন ৪ থেকে ৫টি দালাল সিন্ডিকেট ছিল। এই দালাল সিন্ডিকেট সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত নামজারি, খাজনা দাখিলা ও ঝামেলাপূর্ণ জমিতে খরিদ্দার ধরা। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সিন্ডিকেট সরেজমিনে অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে ভূমি সহায়তা কেন্দ্রের মুরাদ ও অফিস সহায়ক সুমি সিন্ডিকেট। মুরাদ-সুমি দুজনে স্বামী-স্ত্রী। অফিস সহায়ক সুমির সাথে ছিল নায়েব শর্মিষ্ঠার সুসম্পর্ক আর এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজার সাথে ছিল শর্মিষ্ঠার ঘনিষ্ঠতা। বিভিন্ন সময়ে অফিসের গাড়িতে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যেত বদরুদ্দোজা-শর্মিষ্ঠাকে। স্ত্রী সুমিকে ব্যবহার করে মুরাদ বড় বড় ফাইল সিন্ডিকেট করত। নামজারিতে মুরাদ নিত ৭ হাজার, রিপোর্টের জন্য নিত ৪ হাজার টাকা। নামজারির জন্য নায়েব শর্মিষ্ঠা পেত ১ হাজার, এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজা পেত ১২ শত টাকা। আর রিপোর্ট প্রদানের জন্য নায়েব শর্মিষ্ঠা পেত ২ হাজার টাকা, বাকি টাকা হাতিয়ে নিত মুরাদ-সুমি সিন্ডিকেট। সম্প্রতি একটি দলিলের নামজারির জন্য ৪৩,৫০০ টাকা নিয়েছেন মুরাদ-সুমি সিন্ডিকেট। ভুক্তভোগী সদরের বাকালের বাসিন্দা হানিফ বাদী হয়ে সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করেছেন। আবেদনে উল্লেখ করেছেন, ভূমি সহায়তা কেন্দ্রে মুরাদ একটি জমির নামজারি বাবদ ৪৩,৫০০ টাকা নিয়েছে। টাকা নিয়ে ভুল দাগ নম্বর দিয়ে নামজারি করে দিয়েছে। পরবর্তীতে মুরাদের কাছে টাকা ফেরত চাইলে বলে, ‘টাকার ভাগ এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজা, নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার ও রনি পালকে দিয়েছি।’ হানিফের টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন মুরাদ-সুমি। শুধু হানিফ নয়, মুরাদ-সুমির বিরুদ্ধে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার শতাধিক অভিযোগ রয়েছে। পূর্বে মুরাদ-সুমির বিরুদ্ধে এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজার কাছে ডজনখানেক অভিযোগ দিলেও প্রতিকার মেলেনি। খোদ মুরাদ-সুমি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত বদরুদ্দোজা ও শর্মিষ্ঠা সরকার।ভুক্তভোগী সদরের ইটাগাছার বাসিন্দা মোক্তার রহমান বলেন, আমার একটি জমি নামজারির জন্য ভূমি সহায়তা কেন্দ্রের মুরাদ থেকে আবেদন করি। আবেদন করে নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে জমা দিই। শর্মিষ্ঠা কাগজে ভুল দেখিয়ে নামজারি আবেদন বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে মুরাদ ১০ হাজার টাকা দাবি করে নামজারির জন্য। মুরাদকে ১০ হাজার টাকা দিলে একই কাগজে নায়েব শর্মিষ্ঠা নামজারি অনুমোদন দেন।আরেক ভুক্তভোগী শহরের চালতেতলার বাসিন্দা করিম গাইন বলেন, আমার একটা জমির রিপোর্ট প্রদানের জন্য নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে যাই। নায়েব শর্মিষ্ঠা রিপোর্ট না দিয়ে ঘুরাতে থাকে। পরবর্তীতে আমার পরিচিত উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রনি পালের কাছে গেলে সে ৫ হাজার টাকা দাবি করে। নায়েব শর্মিষ্ঠাকে দিয়ে রিপোর্ট প্রদানের আশ্বাস দেয়। রনি পালকে ৫ হাজার টাকা দিলে নায়েব শর্মিষ্ঠা রিপোর্ট প্রদান করে।নাগরিক নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, সদর ভূমি অফিস ছিল ঘুষের অভয়ারণ্য। এই ভূমি অফিসে খোদ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত এসিল্যান্ড বদরুদ্দোজা ও নায়েব শর্মিষ্ঠা। তারা দুজনে মিলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শর্মিষ্ঠা ইতিমধ্যে ‘ঘুষের মহারানী’ হিসেবে খেতাব পেয়েছে। তাদের দুর্নীতির সিন্ডিকেটে খোদ বিভাগীয় কমিশনার অতিষ্ঠ হয়ে দুজনকে শাস্তিমূলক বদলি করেছেন। এখন দরকার এদের নিয়ন্ত্রণাধীন দালাল সিন্ডিকেট নির্মূল করা।অভিযুক্ত সদর ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক সুমি বলেন, “আমি সদর ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক পদে ও আমার স্বামী ভূমি সহায়তা কেন্দ্রের দায়িত্বে। অফিসারদের সাথে আমার সুসম্পর্ক থাকার কারণে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। হানিফের থেকে ৪৩,৫০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান।আরেক অভিযুক্ত ভূমি সহায়তা কেন্দ্রের মুরাদকে ফোন দিলে তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে ফোন কেটে দেন।
আপনার মতামত লিখুন :