
বিশেষ প্রতিনিধি : চিকিৎসার নামে রীতিমতো ‘কসাইখানা’ খুলে বসেছেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতালের মালিক মোঃ মিলন হোসেন। ভুলভাল চিকিৎসা ও ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। উপজেলা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক বিশাল গ্রাম ডাক্তার দালাল সিন্ডিকেট, যাদের মাধ্যমে অসহায় রোগীদের নিয়ে এসে চিকিৎসার নামে চালানো হচ্ছে পকেট কাটার উৎসব। আর অসহায় মানুষের এই রক্তের টাকায় মোটা অঙ্কের কমিশন চলে যাচ্ছে দালাল গ্রাম ডাক্তারের পকেটে।প্রতারক মিলন হোসেনের জালিয়াতি শুধু হাসপাতাল বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের রক্ত চুষে খাওয়ার জন্য তিনি খুলে বসেছেন আরও এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ‘নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ। চিকিৎসার আড়ালে সমবায় সমিতির নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গ্রাহকদের পথে বসিয়েছেন এই প্রতারক। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা ও মানুষ ঠকানোর উৎসব চললেও, নিউজ প্রকাশের পরও রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।তবে এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা সমবায় অফিসারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইতিবাচক সাড়া দেন। সদ্য যোগদানকৃত এই কর্মকর্তা বলেন,আমি নতুন যোগদান করেছি। তবে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ আমি শুনেছি। দ্রুতই ‘নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ’-এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতালে কোনো নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক, স্বীকৃত প্যাথলজিস্ট বা প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা নার্স নেই। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছে এই ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বাণিজ্য। সরকারি হাসপাতালের মান নিয়ে নেতিবাচক অপপ্রচার চালিয়ে মিলন হোসেনের বেতনভুক্ত দালালচক্র প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সরল,সোজা রোগী ধরে নিয়ে আসে। এরপর কোনো প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই করা হয় একগাদা অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া টেস্ট।ভুক্তভোগী মোস্তফা সদ্দার (৫৫) জানান, তিনি কেবল ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে গিয়ে এক দালালের খপ্পরে পড়েন। সেখানে কোনো প্যাথলজিস্ট না থাকলেও রিপোর্টে ভুয়া সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে তাকে কিডনি রোগী বানিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।চিকিৎসা বাণিজ্যের পাশাপাশি মিলন হোসেন সমবায় সমিতির নামে খুলেছেন সুদের ফাঁদ। ১ লক্ষ টাকা জমা রাখলে মাসে ৩ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কালিগঞ্জের দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেন তিনি।বর্তমানে লাভের টাকা তো দূরের কথা, আসল টাকা চাইতে গেলে গ্রাহকদের হুমকি,ধমকি দেওয়া হচ্ছে। মিলন হোসেন দম্ভোক্তি করে বলছেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সাংবাদিকদের কাছে গেলে এক টাকাও ফেরত দেওয়া হবে হবে না।” স্থানীয়রা বলছেন, অতীতে সাতক্ষীরাকে নিঃস্ব করে দেওয়া ‘বর্ষা এনজিও’ এর মতোই কালিগঞ্জের মানুষকে পথে বসাচ্ছে মিলনের এই তথাকথিত কল্যাণ সমবায় সমিতি।সাতক্ষীরা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো Medical and Dental Council Act, 2010 অনুযায়ী এবং বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982 অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া ভুয়া সিল ব্যবহার ও টাকা আত্মসাতের কারণে দণ্ডবিধির (Penal Code, 1860) ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে হাসপাতালটি বন্ধ করা হলেও একটি মহলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তারা পুনরায় এটি চালু করেছে। সংবাদ প্রকাশের পর পুনরায় অভিযান চালিয়ে এটি স্থায়ীভাবে সিলগালা করা হবে।এরই মধ্যে জেলা সমবায় কর্মকর্তার নতুন আশ্বাসে বুক বাঁধছেন নিঃস্ব হওয়া শত শত আমানতকারী। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা মোঃ মিলন হোসেনকে গ্রেপ্তার এবং আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারে প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।
আপনার মতামত লিখুন :