​নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতালের আড়ালে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা ও চিকিৎসার নামে জালিয়াতি, ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুলাই ১৪, ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ন /
​নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতালের আড়ালে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা ও চিকিৎসার নামে জালিয়াতি, ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা

​বর্তমান সাতক্ষীরা ডেস্ক : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল ও এর আড়ালে গড়ে ওঠা ‘নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ’-এর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠছে। একদিকে ভুয়া রিপোর্ট, অপ্রয়োজনীয় টেস্টের নামে রোগীদের পকেট কাটা এবং লাইসেন্সবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বাণিজ্য অন্যদিকে ‘সমবায় সমিতি’র নামে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হওয়ার মতো ভয়ঙ্কর প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে প্রতিষ্ঠানটি।​স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানের মূল হোতা মোঃ মিলন হোসেনের লালসার শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন কালিগঞ্জের শত শত গরিব, অসহায় ও দিনমজুর মানুষ।সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের বিভ্রান্ত করে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত টেস্ট করিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এমনকি ভুয়া ও ভুলভাল রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের আতঙ্কিত করার অভিযোগও রয়েছে মোঃ মিলন হোসেনের বিরুদ্ধে।নলতা ইউনিয়নের বাসিন্দা ভুক্তভোগী মোস্তফা সদ্দার (৫৫) জানান, তিনি কেবল ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত এক  ব্যক্তি নিজেকে ডক্টর  পরিচয় দিয়ে তাকে বলেন, “আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনিতেও সমস্যা আছে। তাকে একগাদা অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দেওয়া হয়। মোস্তফা সদ্দার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখি বারবার নতুন নতুন টেস্ট করাতে বলা হচ্ছে। এতে আমরা সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি এবং অযথা টাকা খরচ করতে বাধ্য হই।অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক, স্বীকৃত প্যাথলজিস্ট বা প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমা নার্স নেই। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কোনো কিছুরই বালাই নেই এখানে। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানে কোনো প্যাথলজিস্ট না থাকলেও রিপোর্টে প্যাথলজিস্টের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি জালিয়াতি।হাসপাতালের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষার মান নিয়ে নেতিবাচক অপপ্রচার চালিয়ে নিজস্ব দালালচক্রের মাধ্যমে তারা রোগী সংগ্রহ করে। যেসব পরীক্ষা এই প্রতিষ্ঠানে করা সম্ভব নয়, সেগুলো সাতক্ষীরার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশনভিত্তিক চুক্তিতে করানো হয়।চিকিৎসা বাণিজ্যের আড়ালে মিলন হোসেন খুলে বসেছেন মানুষের ভিটেমাটি ও সঞ্চয় কেড়ে নেওয়ার আরেক ফাঁদ’নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ। কালিগঞ্জ উপজেলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে লোভ দেখিয়ে বলা হতো ১ লক্ষ টাকা জমা রাখলে মাসে ৩ হাজার টাকা লাভ দেওয়া হবে। এই ফাঁদে পা দিয়ে এলাকার অসহায় মানুষ কোটি কোটি টাকা আমানত রাখেন।বর্তমানে লাভের টাকা তো দূরের কথা, আসল টাকাই ফেরত পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা একা মিলন হোসেন নিজের পেটে ঢুকিয়েছেন। এখন পাওনা টাকা চাইতে গেলে উল্টো গ্রাহকদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অসহায় ভুক্তভোগী বলেন, “মিলন হোসেন আমাদের হুমকি দিয়ে বলছে যদি তোমরা গণমাধ্যমকর্মী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দাও, তবে একটা টাকাও ফেরত পাবে না। স্থানীয়রা বলছেন অতীতে ‘চায়না বাংলার মালিক মৃত আনিসের ‘বর্ষা এনজিও’ যেভাবে সাতক্ষীরার মানুষকে নিঃস্ব করেছিল, ঠিক একইভাবে এই তথাকথিত কল্যাণ সমবায় সমিতি কালিগঞ্জের মানুষকে পথে বসিয়েছে।এদিকে ​​আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা The Medical and Dental Council Act, 2010 অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিবন্ধিত প্যাথলজিস্ট ছাড়া রিপোর্ট দেওয়া BMDC বিধিমালার পরিপন্থী। এছাড়া বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালানো The Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982 অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ, যার ফলে প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।তাছাড়া গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ ও ভুয়া সিল ব্যবহারের কারণে Penal Code, 1860–এর ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৮ ও ৪৭১ (জালিয়াত) ধারা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।নাগরিক নেতা ইদ্রিস আলী বলেন,অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা এবং ডাকাতি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভুল রিপোর্টে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে এবং বড় সামাজিক বিপর্যয় ঘটবে।এসব গুরুতর বিষয়ে অভিযুক্ত মোঃ মিলন হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। শুধু তাই নয়, তিনি কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা আইনকে তোয়াক্কা করেন না বলেও দম্ভোক্তি প্রকাশ করেন।এ বিষয়ে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এর আগেও নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একটি মহলের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব দেখিয়ে তারা আবার এটি চালু করেছে। আপনারা সংবাদ প্রকাশ করুন। এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা আবারও দ্রুত অভিযান চালাব এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিয়ে হাসপাতালটি স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়া হবে।ভুক্তভোগী ও স্থানীয় এলাকাবাসী এখন এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা মিলন হোসেনের গ্রেফতার এবং তাদের আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।