কালীগঞ্জে ‘সুদ সম্রাট’ বারী ফাঁকা স্ট্যাম্প-ব্লাঙ্ক চেকে জিম্মি শত শত পরিবার, কুপ্রস্তাবে অতিষ্ঠ নারীরা!


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুন ২৮, ২০২৬, ৪:২১ অপরাহ্ন /
কালীগঞ্জে ‘সুদ সম্রাট’ বারী ফাঁকা স্ট্যাম্প-ব্লাঙ্ক চেকে জিম্মি শত শত পরিবার, কুপ্রস্তাবে অতিষ্ঠ নারীরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশের পর কৌশল বদলে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের তথাকথিত ‘জিম পোল্ট্রি ফিড’-এর পরিচালক আব্দুল বারী। এবার তার টার্গেটে পরিণত হয়েছে এলাকার সহজ-সরল ও অসহায় নারীরা। চড়া সুদের জাল পেতে, ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের(ফাঁকা)চেকে স্বাক্ষর নিয়ে তিনি নারীদের সুদের টাকা দিচ্ছেন। পরবর্তীতে সেই টাকার জন্য সাধারণ পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সুদের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে নারীদের সম্ভ্রমহানি ও জমি লিখে নেওয়ার মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠেছে এই লেবাসধারী মহাজনের বিরুদ্ধে।অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগে আব্দুল বারীর ভেজাল ফিড ও চড়া সুদের খপ্পরে পড়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে বহু খুচরা ব্যবসায়ী ও পোল্ট্রি খামারি। লোকসানের মুখে পড়ে শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করে আব্দুল  বারীর টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে অনেককে।স্থানীয় কৃষ্ণনগর এলাকার ভুক্তভোগী জামিলা বেগম (৪৫) জানান, বারীর কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে তিনি আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব। সময়মতো সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আব্দুল বারী তাকে দিনের পর দিন কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছে। শুধু জামিলাই নন, এলাকার একাধিক নারী অভিযোগ করেছেন যে, টাকা পরিশোধ করতে না পারলে ইজ্জত বাঁচাতে তারা কম দামে নিজেদের জমি আব্দুল বারীর নামে লিখে দিতে বাধ্য হয়েছেন।অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কৃষ্ণনগর এলাকায় আব্দুল বারীর একটি গোপন আস্তানা রয়েছে। সুদের টাকা দিতে না পারলে বারীর নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ভুক্তভোগীদের ওই আস্তানায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আটকে রেখে মারধর ও মানসিক নির্যাতন করার পর, টাকা দিলে বা জমি লিখে দিলেই কেবল মুক্তি মেলে। এছাড়াও এই গোপন আস্তানায় নকল পোল্ট্রি ফিড ও ভেজাল ওষুধ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে অসামাজিক কার্যকলাপ চলে বলে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।আব্দুল বারী শুধু সুদের ব্যবসাই করছেন না, তার মালিকানাধীন জিম পোল্ট্রি ফিডের মাধ্যমে এলাকায় নকল ও নিম্নমানের ফিড এবং ভেজাল পোল্ট্রি ওষুধ সরবরাহ করছেন। এই ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ খেয়ে এলাকার শত শত খামারির মুরগি মারা যাচ্ছে। ফলে খামারিরা ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে লোকসান গুনছেন, আর গরিবের রক্ত চুষে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন বারী।এসব বিষয়ে সরাসরি আব্দুল বারীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি চরম ক্ষিপ্ত হন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে বলেন, “আমার নামে সংবাদ প্রকাশ করলে মেরে ফেলবো। প্রকাশ্যেই তিনি সাংবাদিকদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন।​সংশ্লিষ্ট আইনি ধারা ও শাস্তি (যা এই অপরাধের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য)​আব্দুল বারীর এই সমস্ত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মারাত্মক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।দণ্ডবিধি ৫০৬ ধারা ( criminal intimidation বা প্রাণনাশের হুমকি)সাংবাদিকদের বা ভুক্তভোগীদের ‘মেরে ফেলার হুমকি’ দেওয়া এই ধারার অধীনে গুরুতর অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে।দণ্ডবিধি ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারা (Extortion বা জোরপূর্বক আদায়) ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্লাঙ্ক চেক জিম্মি করে টাকা ও জমি লিখে নেওয়া জোরপূর্বক আদায়’ বা বলপ্রয়োগের শামিল। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড।​দণ্ডবিধি ৩২৩, ৩২৪ ও ৩৪২ ধারা (মারধর ও অবৈধভাবে আটকে রাখা)কৃষ্ণনগরের গোপন আস্তানায় তুলে নিয়ে আটকে রাখা এবং মারধর করা দণ্ডবিধির অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অবৈধভাবে আটকে রাখার জন্য ১ বছরের কারাদণ্ড এবং মারধরের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির বিধান রয়েছে।দণ্ডবিধি ৫০৯ ধারা ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (৯/৪ ধারা)অসহায় নারীদের দিনের পর দিন কুপ্রস্তাব দেওয়া এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতায় পড়ে। কুপ্রস্তাব ও যৌন হয়রানির (Sexual Harassment) জন্য এই আইনে কঠোর শাস্তির (অনধিক ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড) বিধান রয়েছে।দণ্ডবিধি ২৭৪ ও ২৭৫ ধারা (ওষুধে ভেজালকরণ ও বিক্রয়) পোল্ট্রি বা পশু চিকিৎসায় ভেজাল ওষুধ তৈরি ও সরবরাহ করা এই ধারায় অপরাধ। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আইন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ বিক্রির অপরাধে অনূর্ধ্ব ১ থেকে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।​​এদিকে,এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই রক্তচোষা, নারীলোভী ও প্রতারক আব্দুল বারীর হাত থেকে বাঁচতে এবং তার সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচার বন্ধে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন।