সোনালী আঁশে ফিরছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য, বাড়ছে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ


News Desk (s) প্রকাশের সময় : জুন ১৪, ২০২৬, ৯:৪৯ অপরাহ্ন /
সোনালী আঁশে ফিরছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য, বাড়ছে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ
রায়হান শেখ, বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পাট। একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিশ্ববাজারে পরিচিত ছিল এই ‘সোনালী আঁশ’। পরিবেশবান্ধব ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বিশ্বজুড়ে যখন প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা বাড়ছে, তখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের মাঝেও পাট চাষ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও মাগুরাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এবার পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
একসময় পাট ছিল এ অঞ্চলের কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল। পরবর্তীতে ধান, মাছ ও অন্যান্য লাভজনক ফসলের বিস্তারের কারণে অনেক এলাকায় পাটের আবাদ কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, সরকারি প্রণোদনা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পাট চাষকে আবারও নতুন করে সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল তাপমাত্রার কারণে অধিকাংশ এলাকায় পাটের বীজ অঙ্কুরোদগম এবং গাছের বৃদ্ধি সন্তোষজনক হয়েছে। মাঠজুড়ে এখন দৃষ্টিনন্দন সবুজ পাটক্ষেত কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পাট উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ অঞ্চলে প্রধানত তোষা জাতের পাটের আবাদ বেশি হলেও বর্তমানে উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাতের পাট চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর মধ্যে জেআরও-৫২৪, বিজেআরআই-৯ (সবুজ সোনা), বিজেআরআই-৮, বিজেআরআই-৯৮৯৭সহ বিভিন্ন জাত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এসব জাত তুলনামূলকভাবে অধিক ফলনশীল, রোগবালাই সহনশীল এবং উন্নতমানের আঁশ উৎপাদনে সক্ষম।
যশোর জেলার অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর ও ঝিকরগাছা এলাকায় পাট চাষের ব্যাপক বিস্তার দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধান ও অন্যান্য ফসলের তুলনায় পাটের বাজারমূল্য ভালো থাকায় তারা এবার আবাদ বাড়িয়েছেন। একইভাবে মাগুরার শ্রীপুর, মহম্মদপুর ও সদর উপজেলায়ও পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে নদী-খালবেষ্টিত পরিবেশ পাট চাষের জন্য অনুকূল হলেও জলাশয় ভরাট ও সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় জাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মোল্লাহাট, ফকিরহাট, চিতলমারী, ডুমুরিয়া ও তেরখাদা এলাকার কৃষকরা পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জলাশয়ের অভাবের কথা জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার অনেক কৃষকও এবার পাট চাষে ঝুঁকেছেন। কৃষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা বাড়ার কারণে পাটের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদে পাট চাষকে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পাট জাগ দেওয়ার উপযুক্ত জলাশয়ের সংকট, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং বাজারে দামের ওঠানামা কৃষকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কৃষকের মতে, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবাদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষি ও পাট উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকার “উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ” প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের মাঝে উন্নত জাতের বীজ বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং মাঠ পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উন্নত বীজ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নতমানের আঁশ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাট শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি। বর্তমানে পাট থেকে ব্যাগ, কার্পেট, জিও-টেক্সটাইল, কম্পোজিট বোর্ড, আসবাবপত্র, কাগজ, সজ্জা সামগ্রীসহ শতাধিক পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা বাংলাদেশের পাট শিল্পের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাটভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই খাত।
সবুজে মোড়ানো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ পাটক্ষেত আজ যেন নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। কৃষকদের পরিশ্রম, সরকারের সহায়তা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ‘সোনালী আঁশ’ আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও মাগুরার কৃষকদের চোখে-মুখে এখন সেই স্বপ্নই ফুটে উঠেছে—পাটের ঐতিহ্য ফিরুক, সমৃদ্ধ হোক কৃষকের জীবন, শক্তিশালী হোক দেশের অর্থনীতি।