সীমান্তে এবার মাদক ও সোনা পাচারকারীদের সেফ জোন ‘এমআর ব্রিকস’: নেপথ্যে ডাবলু,নাসিম সিন্ডিকেট!


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুন ২৯, ২০২৬, ১:১০ পূর্বাহ্ন /
সীমান্তে এবার মাদক ও সোনা পাচারকারীদের সেফ জোন ‘এমআর ব্রিকস’: নেপথ্যে ডাবলু,নাসিম সিন্ডিকেট!

​পরিবেশ ধ্বংস ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের পর এবার সীমান্ত অপরাধের অভয়ারণ্য; প্রশাসনের নির্দেশ ও জরিমানা তোয়াক্কা না করেই চলছে অবৈধ সাম্রাজ্য

বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার কদমতলা ও কুশখালি সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক বিশাল অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে প্রভাবশালী ‘ডাবলু-নাসিম’ সিন্ডিকেট। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ ইটভাটায় পরিবেশ ধ্বংস এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রি-লেবেলিংয়ের পর এবার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উঠেছে আরও ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। কুশখালি সীমান্ত দিয়ে আসা ফেনসিডিল, কোরেক্স, মদের মতো মারাত্মক মাদক এবং ঢাকা-সাতক্ষীরা রুটে বাইপাস দিয়ে ভারতে পাচার হওয়া সোনার অন্যতম নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে তাদের যৌথ মালিকানার ‘এমআর ব্রিকস’।অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাশেমপুর জামতলা এলাকায় অবস্থিত ‘এমআর ব্রিকস’ নামের ইটভাটাটি এখন আর কেবল ইট পোড়ানোর ভাটায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সীমান্ত অঞ্চলের মাদক ব্যবসায়ী ও সোনা পাচারকারীদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল। স্থানীয়দের মতে, কুশখালি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ উপায়ে আসা ভারতীয় ফেনসিডিল, কোরেক্স ও মদের বড় বড় চালান প্রথমে এনে খালাস করা হয় এই ইটভাটায়। এরপর এখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শুধু তাই নয়, ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা রুটের বাইপাস সড়ক ব্যবহার করে যত সোনা ভারতে পাচার হয়, সেই পাচারকারী চক্রের সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে প্রথম নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নেন এই এমআর ব্রিকসকে। আর এই মাদক ব্যবসায়ী ও সোনা পাচারকারীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে পর্দার আড়াল থেকে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ভাটার মালিক গ্রাম্য ডাক্তার মিজানুর রহমান ডাবলু ও নাসিম চক্র।​এই ভয়ংকর মাদক ও সোনা পাচারের অপরাধের সমান্তরালে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এই সিন্ডিকেটের পরিবেশ ধ্বংস ও স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্য এক কালো সাম্রাজ্য। কদমতলা হাটের ‘মেসার্স রহমান ফার্মেসি’র আড়ালে চলছে এই চক্রের অন্যতম হোতা শেখ নাসিম আলীর ভয়ংকর জালিয়াতি। বাইরে সাধারণ ওষুধের দোকান মনে হলেও এর দোতলায় মজুত করে রাখা হয় বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ (ডেট এক্সপায়ার ওষুধ) ও ইন্ডিয়া অবৈধ  কোরেক্স। কোনো বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চালানো এই ফার্মেসির দোতলায় বসে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের গায়ে নতুন করে ভুয়া সিল ও লেবেল লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই ‘বিষ’ কম মূল্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দক্ষিণবঙ্গের শ্যামনগর ও কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে। এই জাল ওষুধ সেবন করে এলাকার মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।​পৌরসভাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০১৮ সালের পর দীর্ঘ ৬ বছর লাইসেন্স নবায়ন না করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়েছেন নাসিম আলী। সম্প্রতি ২০২৫ সালে এসে মাঝখানের বিশাল রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মোটা অঙ্কের কারচুপির মাধ্যমে লাইসেন্স আপডেট করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।​নাসিম আলীর এই সমস্ত অবৈধ কর্মকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী ও ব্যবসায়িক অংশীদার তার বন্ধু মিজানুর রহমান ডাবলু। এই দুজন মিলে কাশেমপুর জামতলায় পরিচালনা করছেন ‘এমআর ব্রিকস’ নামের সম্পূর্ণ অবৈধ ইটভাটাটি। ভাটার কোনো পরিবেশ লাইসেন্স নেই, নেই জেলা প্রশাসন বা ডিসি অফিসের কোনো ছাড়পত্র। আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় দিন-রাত এই ভাটায় পুড়ছে বনের কাঠ এবং টায়ারের বিষাক্ত বর্জ্য। ফলে আশেপাশের এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য এখন ধ্বংসের মুখে।​অভিযোগ রয়েছে, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন (ডিসি অফিস) থেকে এমআর ব্রিকস নামক এই অবৈধ ভাটায় অভিযান চালিয়ে প্রথমবার ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তাতেও টনক নড়েনি এই সিন্ডিকেটের। পরবর্তীতে আবারও অভিযান চালিয়ে ২ লাখ টাকা জরিমানা করাসহ ইটভাটাটি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ভাঙা তো দূরের কথা, রহস্যজনক এক ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে প্রতিদিন বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়াচ্ছে এমআর ব্রিকস, আর সমান্তরালে চালাচ্ছে মাদক ও সোনার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারবার।​নাসিম ও ডাবলু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য শুধু জনস্বাস্থ্য, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশ ধ্বংসেই সীমাবদ্ধ নেই, নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের পকেট কাটায়। ইট দেওয়ার নাম করে এলাকার শত শত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা। অগ্রিম টাকা দিয়েও মাসের পর মাস ঘুরে কোনো ইট পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। উল্টো পাওনা ইট চাইতে গেলে মিলছে হুমকি-ধমকি। একদিকে সীমান্ত অপরাধ ও পরিবেশের ক্ষতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করে কোটিপতি বনে যাচ্ছে এই সিন্ডিকেট।​এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শেখ নাসিম আলী ও মিজানুর রহমান ডাবলুর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।দুই দুইবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানার পরও কীভাবে একটি অবৈধ ইটভাটা সগৌরবে চলে এবং মাদক ও সোনা পাচারকারীদের সেফ জোনে পরিণত হয় তা নিয়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এই জালিয়াতি ও পাচারকারী চক্রের মূলহোতা শেখ নাসিম আলী ও মিজানুর রহমান ডাবলুর বিরুদ্ধে অতি দ্রুত ড্রাগ প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের যৌথ ও কঠোরতম আইনগত পদক্ষেপ কামনা করছেন সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ।