​ক্লিকবেইটের যুগ ও সুসাংবাদিকতার সংকট


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুন ১০, ২০২৬, ১:০৬ পূর্বাহ্ন /
​ক্লিকবেইটের যুগ ও সুসাংবাদিকতার সংকট

সম্পাদকীয়…………..

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। আর এই স্তম্ভের মূল ভিত্তি হলো জনমানুষের আস্থা। আজ প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণের যুগে তথ্যের কোনো অভাব নেই; সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তথ্যের এক বিশাল মহাসমুদ্রে আমরা সাঁতার কাটছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল তথ্যের কতটুকু সত্য, কতটুকু বস্তুনিষ্ঠ? তথ্যের এই অতি-অধিক্য বা ‘ইনফোডেমিক’-এর যুগে দাঁড়িয়ে আজ জোরালোভাবে বলার সময় এসেছে কেবল তথ্য প্রকাশ করা সাংবাদিকতা নয়, সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপনই হলো প্রকৃত সুসাংবাদিকতা।

​আজকের যুগে সাংবাদিকতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘গতি’ বনাম ‘সততা’র লড়াই। সবার আগে খবর দেওয়ার এক অন্ধ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতেছে সংবাদমাধ্যমগুলো। ‘ব্রেকিং নিউজ’-এর এই ইঁদুরদৌড়ে অনেক সময়ই খবরের সত্যতা যাচাইয়ের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে, ছড়িয়ে পড়ছে গুজব, অর্ধসত্য আর বিভ্রান্তি। একটি ভুল বা অতিরঞ্জিত খবর সমাজে কতটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, তা আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। মনে রাখা প্রয়োজন, চটকদার কিন্তু অসত্য তথ্য সাময়িক ‘ক্লিক’ বা ‘ভিউ’ এনে দিতে পারে, কিন্তু তা সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতাকে একবারে ধ্বংস করে দেয়।
​একটি অর্ধসত্য বা অসত্য সংবাদ সমাজের জন্য বিষাক্ত গ্যাসের মতো। যা অলক্ষ্যেই মানুষের চিন্তা ও সমাজ কাঠামোকে পঙ্গু করে দেয়।
​বস্তুনিষ্ঠতা হলো সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড। পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সাংবাদিকতার ধর্ম নয়। একজন সাংবাদিকের নিজস্ব রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তাকে অবশ্যই নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। খবরের সব পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়া, তথ্যের উৎস বা সোর্স দ্বিমুখী যাচাই Cross verification করা এবং নিজস্ব মতামতকে খবরের ভেতরে ঢুকিয়ে না দেওয়াই হলো বস্তুনিষ্ঠতার মূল শর্ত। যখন কোনো সংবাদমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠতা হারায়, তখন তা আর সংবাদ থাকে না, তা হয়ে ওঠে ‘প্রচারণা’ বা প্রোপাগান্ডা।
​সুসাংবাদিকতা শুধু তথ্য দেয় না, সমাজকে সচেতন করে, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং শোষিতের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। কিন্তু এই মহান পেশাটি তখনই তার গৌরব হারায়, যখন সাংবাদিকরা হলুদ সাংবাদিকতা বা ক্লিকবেইট সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। করপোরেট স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া সুসাংবাদিকতার পরিপন্থী।
​সুসাংবাদিকতার ​নির্ভুলতা, খবরের প্রতিটি তথ্য ও উপাত্ত শতভাগ সঠিক হতে হবে। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো খবর পরিবেশন করা যাবে না।
​বস্তুনিষ্ঠতা,ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক আবেগ-অনুভূতি ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে তুলে ধরা।
​ভারসাম্য, সংবাদের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পক্ষের বক্তব্য সমান গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা।
​জবাবদিহিতা,কোনো ভুল হলে তা অকপটে স্বীকার করা এবং দ্রুত সংশোধনী প্রকাশ করা।
​সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সংবাদমাধ্যমের দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বহীন স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে, সুস্থ জনমত গঠনে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সুসাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।
​আমরা আশা করি, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংবাদিকরা সব লোভ লালসা, ভয়ভীতি এবং সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ ত্যাগ করে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপনের ব্রত গ্রহণ করবেন। মনে রাখতে হবে, সমাজ যখন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়, তখন সাংবাদিকের হাতের কলমটিই আলোর মশাল হিসেবে কাজ করে। সেই মশালের আলো যেন কখনো নিভে না যায়।