কালিগঞ্জে নায়েব ফয়েজ ও পিয়ন আহম্মদের ঘুষের ‘হাটে’ জিম্মি দুই ইউনিয়ন:রুখবে কে?


নিউজ ডেস্ক প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ন /
কালিগঞ্জে নায়েব ফয়েজ ও পিয়ন আহম্মদের ঘুষের ‘হাটে’ জিম্মি দুই ইউনিয়ন:রুখবে কে?

বর্তমান সাতক্ষীরা ডেস্ক : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর কৃষ্ণনগর ও ২ নম্বর বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি নায়েব) ফয়েজ আহমেদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, নামজারি (খারিজ)সরকারি খাল ও খাসজমি ইজারাসহ নানা ভূমি সেবায় চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একই সঙ্গে দুই ইউনিয়নের দায়িত্বে থেকে তিনি এই ঘুষ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান।স্থানীয়দের দাবি, ঊর্ধ্বতন কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্যতার সুবাদে তিনি বারবার সুবিধাজনক স্থানে বহাল থাকেন নায়েব ফয়েজ। এই অবৈধ আয়ে তিনি নিজ ও বেনামে প্রায় ২০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। শুধু তাই নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদীর সঙ্গে যোগসাজশে অবৈধভাবে ৫০ একরের বেশি খাসজমি ইজারা দেখান। পরবর্তীতে ভুয়া কাগজ বানিয়ে সাঈদ মেহেদী ও ফয়েজ যৌথভাবে সেখানে মাছ চাষের প্রকল্প গড়ে তোলেন। এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও জোরপূর্বক খাস দেখিয়ে দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের আমলে সাইদ মেহেদীর নাম ভাঙিয়ে দাপটের সঙ্গে ফয়েজ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন।২ নম্বর বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ করিম সরদার অভিযোগ করেন, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ ও তদন্ত প্রতিবেদন তৈরিসহ যেকোনো সেবার জন্যই অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়। জমির মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে একরপ্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। এমনকি বিষ্ণুপুরের এক বাসিন্দার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে প্রকৃত পক্ষে তার বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।​১ নম্বর কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম জানান, নামজারির আবেদনের পর তাঁর ফাইল আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে ওই অফিসের পিয়ন আহম্মদ আলী ও নায়েব ফয়েজের দালালচক্রের মাধ্যমে ৮ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পর কাজ হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফয়েজের সব ঘুষের টাকা তুলছেন  পিয়ন আহম্মদ আলী। সম্প্রতি বর্তমান সাতক্ষীরা পত্রিকার প্রতিনিধি টিম সরজমিনে ভূমি অফিসে যেয়ে দেখেন ভিন্ন চিত্র সীমানাপ্রচীরের কোণে গাছের আড়ালে ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের কাছ থেকে পিয়ন আহম্মদ আলী সরাসরি ঘুষের  টাকা আদায় করছেন। একইভাবে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা গফুর সরদার জানান, মাত্র ১০০ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য পিয়ন আহম্মদ আলী সার্ভারের সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করেছেন।স্থানীয়দের মতে, পিয়ন আহম্মদ আলী ও দালালদের মাধ্যম ছাড়া সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কোনো কাজই করাতে পারেন না। আহম্মদ আলী এর আগে বসন্তপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালেও একই ধরনের ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।​স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই ভূমি অফিসে চিত্র ভিন্ন রূপ ধারণ করেন,নায়েব ফয়েজের নেতৃত্বে বসে সারাদিনের আদায় করা ঘুষের টাকা ভাগাভাগির হাট বসান।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষ্ণনগরের এক বিএনপি নেতা  বলেন, আমার জীবনে এত বড় ঘুষখোর নায়েব দেখিনি। ঘুষের টাকায় তিনি আলিশান বাড়ি-গাড়ি করেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের এক দরিদ্র পরিবারের নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে। যা জানাজানি হলে পরে অর্থ দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়।​অনুসন্ধানে জানা যায়, নায়েব ফয়েজ কালিগঞ্জ উপজেলার পানিয় মৌতলা এলাকার এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর।প্রতিনিয়ত কাজ না করলে ঠিক মত খাওয়া হতো না। কিন্তু ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর রাতারাতি কোটিপতি বনে যান নায়েব ফয়েজ। মৌতলা এলাকায় অবৈধ উপার্জনে তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে একটি দোতলা আলিশান বাড়ি তৈরি করেছেন। সরকারি চাকরির আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে তাঁর বর্তমান জীবনযাত্রার মানের স্পষ্ট গরমিল রয়েছে।এদিকে সাতক্ষীরা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি পদে আসীন থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করা। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারি বেতনের বাইরে তাঁর এই বিপুল সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবিলম্বে তাঁর সম্পদ বিবরণী তলব করতে পারে এবং অপরাধজনক অসদাচরণের (Criminal Misconduct) দায়ে মামলা রুজু করতে পারে।​এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে স্পষ্ট চাকরি বিধি ভঙ্গের প্রমাণ রয়েছে। ঘুষ গ্রহণ,ফাইল আটকে রাখা, দালালচক্র লালন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত (Suspension) করে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে পারেন।​অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে নায়েব ফয়েজ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যদিকে, পিয়ন আহম্মদ আলীর বক্তব্য নিতে গেলে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি ভূমি অফিসের পিছন দিয়ে পালিয়ে যান।সুশাসনের জন্য নাগরিক নেতা আবুল হোসেন বলেন,এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁর অর্জিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।