
বর্তমান সাতক্ষীরা ডেস্ক :সাতক্ষীরার বাঁকাল জয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আড়ালে হানিট্রাপ ও গোপনে যৌন ব্যবসা হয়। শুধু যৌন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না করে রোগীদের বিভ্রান্ত করে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত টেস্ট করিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা: সমীর কুমার দাশের বাবা হাতুড়ে প্যাথলজিস্ট নিয়ে এসে ভুল রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের আতঙ্কিত করার অভিযোগও উঠেছে।ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোগীরা নির্দিষ্ট একটি সমস্যা নিয়ে পরীক্ষার জন্য গেলেও তাদেরকে অন্য রোগের আশঙ্কা দেখিয়ে একের পর এক পরীক্ষা করানো হয়।ফিংড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ভুক্তভোগী গফুর গাজী (৫৫) বলেন, “আমি ডা: সমীর কুমার দাশের কাছে মেরুদণ্ডের সমস্যার জন্য জয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলে সেখানে উপস্থিত থাকা এক ব্যক্তি নিজেকে রেডিওলজিস্ট পরিচয় দিয়ে জানান, ‘আপনার শুধু মেরুদণ্ড সমস্যা না। এই বলে আমাকে ভয়ংকর রোগের ভয় দেখিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা করিয়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এছাড়াও তাকে বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে আমরা সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি এবং অযথা টাকা খরচ করতে বাধ্য হই।এদিকে আরেক ভুক্তভোগী মোস্তফা সরদার (৬৫) বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে ভালো কোনো দক্ষ রেডিওলজিস্ট ও প্যাথলজিস্ট নেই এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাইও নেই। সব জায়গায় নোংরা। শুধু তাই নয়, কিছুক্ষণ পরপর অল্প বয়সের স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে আসে, একটি রুমে প্রবেশ করে আবার ২০-৩০ মিনিট পর বের হয়ে যায়।আমার দেখে মনে হলো এই ডায়গনিক সেন্টারে শুধু ডাক্তারি কার্যক্রম হয় না যৌন ব্যবসাও চলে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, সিভিল সার্জন কর্তৃক অনুমোদিত হালনাগাদ লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থা নেই।প্রতিষ্ঠানটিতে পাস করা প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট না থাকলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টে সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি জালিয়াতির শামিল বলে মনে করছেন সাতক্ষীরার স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা।জয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে আরও ভয়ংকর তথ্য সামনে এসেছে—সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসার মান নিয়ে নেতিবাচক প্রচার চালিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে আসা হয়। গুরুতর পরীক্ষা তাদের প্রতিষ্ঠানে করা সম্ভব না হলে অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিরকুট লিখে পাঠিয়ে কমিশনভিত্তিক চুক্তিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।এমনকি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫’শত গজের ভেতরে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক চালানো আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ।এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ডা: সমীর কুমার দাশের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আইন বলে কোনো কিছু আছে নাকি? সারা বাংলাদেশের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো এভাবেই চলে, আমিও এভাবেই চলবো।”তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সরকারের আমলে কোন কাজটা সঠিকভাবে হচ্ছে? আপনারা পারলে নিউজ করে কিছু করে নিন।”এ বিষয়ে সাতক্ষীরার নাগরিক নেতারা বলেন, “একজন সরকারি চিকিৎসক হয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে অস্বীকার বা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন না। এটি স্পষ্টতই অসদাচরণ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।”তারা আরও দাবি করেন, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা অবৈধ ডায়াগনস্টিক পরিচালনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।এদিকে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন আপডেট ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা The Medical and Dental Council Act, 2010 অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিবন্ধিত চিকিৎসক বা প্যাথলজিস্ট ছাড়া পরীক্ষা-রিপোর্ট প্রদান Bangladesh Medical and Dental Council (BMDC) বিধিমালার পরিপন্থী। এছাড়া বৈধ লাইসেন্স ও নির্ধারিত মানদণ্ড ছাড়া ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করা The Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982 অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ; প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার ক্ষমতা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।এছাড়া Penal Code, 1860-এর ৪২০ ধারায় প্রতারণা, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় জাল সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার এবং অবহেলার কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে ৩০৪এ ধারায় ফৌজদারি দায় প্রযোজ্য হতে পারে। ভ্রান্ত বা প্রতারণামূলক সেবার ক্ষেত্রে Consumer Rights Protection Act, 2009 অনুযায়ী জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা Fire Prevention and Extinguishing Act, 2003 অনুযায়ীও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাতক্ষীরা ‘ভুল চিকিৎসা ও রিপোর্টের কারখানা’ আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অবৈধভাবে পরিচালিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। আপনারা বিষয়টি তুলে ধরলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
আপনার মতামত লিখুন :